স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: বাংলাদেশে প্রতি আটজন ব্যক্তির মধ্যে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক। অথচ অধিকাংশ বাহকই জানেন না যে তাদের শরীরে থ্যালাসেমিয়ার জিন রয়েছে। অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস-এ প্রকাশিত বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বাহকের এই উচ্চ হার উঠে এসেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়ার মতো বংশগত রোগ প্রতিরোধে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার পাশাপাশি বাহক শনাক্তকরণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতার রোগ। বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া জিনের মাধ্যমে এ রোগ সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়ায় জিনগত ত্রুটি থাকলে থ্যালাসেমিয়া দেখা দিতে পারে।
হিমোগ্লোবিন রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। ফলে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি না হলে শরীরে রক্তস্বল্পতা ও অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়।
থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোগের বাহক হওয়া এবং থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়া এক নয়। একজন বাহকের শরীরে সাধারণত গুরুতর কোনো উপসর্গ দেখা যায় না।
অনেক বাহক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন এবং রক্তের বিশেষ পরীক্ষা না করা পর্যন্ত নিজের বাহক হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন না।
কিন্তু একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক যদি আরেকজন বাহককে বিয়ে করেন, তখন তাদের সন্তানের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জেনেটিক উত্তরাধিকারের নিয়ম অনুযায়ী, দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের প্রতিটি গর্ভধারণে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ।
একইভাবে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ এবং থ্যালাসেমিয়ার জিনগত ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ।
অর্থাৎ দুজন বাহকের সন্তান হলে চারটি সম্ভাব্য ফলাফলের মধ্যে একটি ক্ষেত্রে শিশু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হতে পারে, দুটি ক্ষেত্রে শিশু বাহক হতে পারে এবং একটি ক্ষেত্রে শিশু থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন না-ও করতে পারে।
এই হিসাবটি প্রতিটি গর্ভধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং আগের সন্তানের ফলাফলের ওপর পরবর্তী সন্তানের ঝুঁকি নির্ভর করে না।
থ্যালাসেমিয়া মেজর কতটা ভয়াবহ?
থ্যালাসেমিয়ার গুরুতর ধরনগুলোর মধ্যে থ্যালাসেমিয়া মেজর অন্যতম। এই রোগে আক্রান্ত শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত কার্যকর হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। ফলে শিশুর শরীরে তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
আক্রান্ত শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
অনেক থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীর নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ধরে বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমতে পারে।
এই অতিরিক্ত আয়রন নিয়ন্ত্রণ করা না হলে হৃদ্যন্ত্র, যকৃত ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়রন শরীর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য আয়রন কিলেশন থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।
নিয়মিত রক্ত, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ একটি পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
শুধু আর্থিক চাপ নয়, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা রোগী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য মানসিকভাবেও কঠিন। একটি শিশুকে নিয়মিত রক্ত দিতে হওয়া এবং আজীবন চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টে মিলতে পারে নিরাময়ের সুযোগ
থ্যালাসেমিয়া মেজরকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট বা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট নিরাময়মূলক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
উপযুক্ত রোগী এবং উপযুক্ত দাতা পাওয়া গেলে এই চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর স্বাভাবিক রক্তকণিকা তৈরির সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা থাকে।
বিশেষ করে কম বয়সে উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের ফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিবেচিত হয়।
তবে এটি সবার জন্য উপযোগী নয়। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগের জটিলতা, দাতার সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন।
তাই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা কেন জরুরি?
বাংলাদেশে প্রতি আটজনের একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ার তথ্যটি তাই উদ্বেগের পাশাপাশি সচেতনতারও বড় কারণ। কারণ একজন বাহক সাধারণত সুস্থ থাকায় তার মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার কোনো লক্ষণ না থাকলেও ভবিষ্যৎ সন্তানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্তকরণ পরীক্ষা সম্পর্কে তরুণ-তরুণীদের সচেতন করা গেলে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে থ্যালাসেমিয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়া কোনো অপরাধ, লজ্জা বা সামাজিক কলঙ্কের বিষয় নয়। এটি একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য। একজন ব্যক্তি বাহক হওয়ার বিষয়টি জানলে নিজের ভবিষ্যৎ পরিবার ও সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার দিকে নজর দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
পাশাপাশি নতুন করে আক্রান্ত শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য বাহক শনাক্তকরণ, জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেক মানুষ রোগটি সম্পর্কে জানলেও বাহক হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। ফলে কোনো উপসর্গ না থাকায় পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না।
অথচ একজন বাহক আরেকজন বাহককে বিয়ে করলে ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য জটিলতার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো, বাহক শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় জেনেটিক পরামর্শ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সময়মতো সচেতন হলে একটি পরিবার যেমন ভবিষ্যৎ সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারে, তেমনি সমাজও থ্যালাসেমিয়ার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বোঝা কমানোর সুযোগ পেতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতি আটজনের একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক, এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিয়ে এখনই ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
থ্যালাসেমিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা, পরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।