স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; বরং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। তাই সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ না করে তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফএম সিদ্দিকী।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ‘ত্বকের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষটিকে দেখুন’ (লুক বিয়ন্ড মাই স্কিন) প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব সোরিয়াসিস দিবস-২০২৭ পালিত হয়েছে।
এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে একটি বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক শোভাযাত্রা বের করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৫০৭ নম্বর লেকচার হলে একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সোরিয়াসিস অ্যাওয়ারনেস ক্লাব ও বাংলাদেশ ডার্মাটোলজিস্ট সোসাইটি যৌথভাবে এসব কর্মসূচির আয়োজন করে।
শোভাযাত্রার উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফএম সিদ্দিকী বলেন, সোরিয়াসিস একটি দৃশ্যমান ত্বকের রোগ। এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে অন্যদের কাছ থেকে দূরত্ব ও অবহেলার শিকার হন।
এ রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করাই সোরিয়াসিস অ্যাওয়ারনেস ক্লাবের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, সোরিয়াসিস কোনোভাবেই ছোঁয়াচে রোগ নয়। তাই এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়, যাতে তাঁরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত বা অসম্মানিত মনে করেন। রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
উপাচার্য আরও বলেন, সোরিয়াসিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর প্রভাব শুধু ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসে ভুগতে পারেন। এ ধরনের আর্থ্রাইটিস প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তবে সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না হলে এটি গুরুতর রূপ নিতে পারে। এতে হাত-পা, বিভিন্ন অস্থিসন্ধি ও মেরুদণ্ড আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি রোগীর চলাফেরা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হতে পারে।
অধ্যাপক ডা. এফএম সিদ্দিকী বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সোরিয়াসিসের চিকিৎসায় অনেক আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে তাঁরা স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারবেন।
এ জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদেরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সোরিয়াসিস চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব—এ তথ্য সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে শুরু হয়ে টিএসসি প্রদক্ষিণ করে ডি-ব্লকের পাশ দিয়ে সি-ব্লক ও কেবিন ব্লক হয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে গিয়ে শেষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, রেসিডেন্ট, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারীরা অংশ নেন।
শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান ও মেডিক্যাল টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এম আবু হেনা চৌধুরী, বাংলাদেশ ডার্মাটোলজিস্ট সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ মুনীর রশিদ এবং সোরিয়াসিস সচেতনতা ক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সামিউল হক।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, সহযোগী অধ্যাপক ডা. লুবনা খন্দকার, সহযোগী অধ্যাপক ডা. একেএম রেজাউল হক, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোস্তাক মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা, ডা. মোহাম্মদ আবু নাছেরসহ বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক ও চিকিৎসকেরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈজ্ঞানিক সেমিনারে আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা
শোভাযাত্রা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৫০৭ নম্বর লেকচার হলে বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী।
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তিন শতাধিক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। তাঁদের অনেকে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে কর্মসূচিতে যুক্ত হন। এ সময় সোরিয়াসিসের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, রোগের জটিলতা এবং আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সোরিয়াসিস সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সামাজিক জীবন ব্যাহত করতে পারে। তাই রোগীদের প্রতি সহমর্মী আচরণ, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্ব সোরিয়াসিস দিবসের প্রতিপাদ্যও সেই বার্তা তুলে ধরে—একজন মানুষকে শুধু তাঁর ত্বকের দৃশ্যমান পরিবর্তন দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি তাঁর মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। সোরিয়াসিস ছোঁয়াচে নয় এবং চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবহেলা বা বৈষম্যের শিকার না করে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকেরা।