স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগামী জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।
একই সঙ্গে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহে পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং রোগীদের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাঁরা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
‘ডেডিকেটেড বাজেটারি অ্যালোকেশনস ফর এনসিডি প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ইন বাংলাদেশ: অ্যাকসেস টু অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ মেডিসিনস অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ (ডিপিএইচআই)। সহযোগিতা করে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)।
বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। তাঁদের অর্ধেকই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে অবগত নন। অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত প্রকল্প এড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে দুর্নীতিমুক্তভাবে স্বাস্থ্য বাজেট বাস্তবায়ন, প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদার, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীকে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ওষুধ বিতরণব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে ডিপিএইচআইয়ের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ফারিহা হাসিন বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ, যার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ অন্যতম। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ সেবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক রোগীকে নিজস্ব অর্থে ওষুধ কিনতে হয়, যা বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
তিনি ওষুধের প্রাপ্যতা ও সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং এ ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ডিপিএইচআইয়ের অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর ডা. তানজিলা বুশরা বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা নিয়ে একটি পেশেন্ট অ্যাডভোকেসি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা প্রতিরোধে রোগের চিকিৎসা শুরুর আগেই জনসচেতনতা ও কাউন্সেলিং বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে নিম্নমানের ওষুধ প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর এনসিডি কর্নার শক্তিশালী করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা পরিবর্তিত অপারেশনাল প্ল্যান ব্যবস্থায় অসংক্রামক রোগের সেবায় অর্থায়ন সুরক্ষিত রাখা, জাতীয় বাজেটে এনসিডি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক বাজেট লাইন প্রতিষ্ঠা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন।
তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোগীদের নিজস্ব অর্থে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব হবে।
বৈঠকে গৃহীত সুপারিশগুলো ‘পলিসি ব্রিফ’ আকারে নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডিপিএইচআইয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল হক। এতে স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিভিডি), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল (এনআইএনএসঅ্যান্ডএইচ), এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল), বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও রোগী অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন জিএইচএআইয়ের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। শেষে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।