স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৭ পি এম

শিশুদের ডিজিটাল জগৎ নিরাপদ করতে যে নিয়মগুলো থাকা উচিত

ছবি : সংগৃহীত

স্মার্টফোনের পর্দায় একের পর এক ভিডিও, অপরিচিত ব্যক্তির বার্তা কিংবা বয়সের অনুপযোগী কনটেন্ট—শিশুরা অনলাইন জগতে প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের শেখা, বিনোদন ও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করলেও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের ঘুম, পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের ডিজিটাল জগৎ নিরাপদ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা জরুরি।

শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু অভিভাবকের নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও। এ জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম কার্যকর করা প্রয়োজন।

বয়স অনুযায়ী ব্যবহার নির্ধারণ

সব বয়সের শিশুর জন্য একই ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিয়ম উপযুক্ত নয়। ছোট শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখা এবং কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী সীমাবদ্ধতা আরোপ করা উচিত। যেসব প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত রয়েছে, সেখানে সেই নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে বয়স যাচাইয়ের সময় শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করাও জরুরি।

স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটালে শিশুদের ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস ব্যাহত হতে পারে। তাই বয়স ও দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার কমানো, পড়াশোনার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ

সহিংসতা, আত্মক্ষতি, বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ, যৌন হয়রানি ও বয়সের অনুপযোগী কনটেন্ট থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুদের অ্যাকাউন্টে বয়সোপযোগী কনটেন্ট দেখানোর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত ও সরিয়ে ফেলার কার্যকর পদ্ধতি থাকা উচিত। কোনো শিশু ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হলে সহজে অভিযোগ জানানোর সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করা

অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শিশুরা প্রতারণা, হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির শিকার হতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে শিশুদের অ্যাকাউন্টে অপরিচিত ব্যক্তির বার্তা, বন্ধুত্বের অনুরোধ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ সীমিত রাখা উচিত। শিশুদের অবস্থান শনাক্ত করার তথ্যও প্রকাশ্যে দেখানো যাবে না।

আসক্তি বাড়ায় এমন ফিচারে নিয়ন্ত্রণ

একটির পর একটি ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়া, অবিরাম স্ক্রল করার সুবিধা এবং ঘন ঘন নোটিফিকেশন শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে পর্দায় আটকে রাখতে পারে। তাই শিশুদের জন্য এসব ফিচার সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর বিরতি নেওয়ার সতর্কবার্তা চালু করা প্রয়োজন। রাতের বেলায় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা

শিশুদের নাম, ঠিকানা, স্কুলের পরিচয়, ফোন নম্বর, অবস্থান ও ব্যক্তিগত ছবি অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাই শিশুদের অ্যাকাউন্ট শুরু থেকেই ব্যক্তিগত রাখা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ না করা এবং বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তাদের অনলাইন আচরণ অনুসরণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। শিশুদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অভিভাবকদের কাছেও স্পষ্ট করা উচিত।

সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

অনলাইনে অপমান, হুমকি, বিদ্রূপ, গুজব ছড়ানো কিংবা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। এসব ঘটনা দ্রুত জানানোর ব্যবস্থা, অভিযোগের কার্যকর তদন্ত এবং হয়রানিকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা জরুরি।

অভিভাবক ও স্কুলের ভূমিকা

শুধু প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ দিয়ে শিশুদের সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। অপরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়া, সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা এবং অনলাইনে কেউ বিরক্ত বা ভয় দেখালে বিশ্বস্ত বড়দের জানানো—এসব বিষয়ে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, যাতে তারা কোনো সমস্যায় পড়লে ভয় না পেয়ে সাহায্য চাইতে পারে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে, অভিযোগের দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় নেওয়া ব্যবস্থাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জ্ঞান অর্জন, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই তাদের ডিজিটাল জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং নিরাপদে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। বয়সভিত্তিক নিয়ম, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অভিভাবক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের জন্য অনলাইন জগৎ আরও নিরাপদ করা সম্ভব।