স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধলেও শুরুতে অনেক সময় বোঝা যায় না। পেটব্যথা, হজমের সমস্যা কিংবা অকারণে ওজন কমে যাওয়াকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান অনেকে। অথচ এসব উপসর্গ কখনো কখনো অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সংকেতও হতে পারে। রোগটি অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত হয়। এর সঙ্গে ক্যানসার কোষের দ্রুত পরিবর্তন, চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তোলে।
অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস পাকস্থলীর পেছনে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খাবার হজমে সাহায্যকারী এনজাইম তৈরির পাশাপাশি এটি ইনসুলিন উৎপাদন করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অগ্ন্যাশয়ের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে শুরু করলে টিউমার তৈরি হয়। এর কিছু টিউমার ক্যানসারে পরিণত হয়।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো ডাক্টাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা। এই ক্যানসারের একটি বড় সমস্যা হলো, এর প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই ক্যানসার আশপাশের টিস্যু কিংবা শরীরের দূরের অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার বিপজ্জনক হওয়ার একটি কারণ হলো, টিউমারের ভেতরে থাকা সব ক্যানসার কোষ একই ধরনের আচরণ করে না। কিছু কোষ তুলনামূলক কম আক্রমণাত্মক হলেও অন্য কিছু কোষ দ্রুত বাড়ে এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অর্জন করে।
সময়ের সঙ্গে ক্যানসার কোষের বৈশিষ্ট্য বদলে যেতে পারে। ফলে চিকিৎসায় কিছু কোষ ধ্বংস হলেও অন্য কিছু কোষ টিকে থাকে এবং পরে আবার রোগের বিস্তার ঘটায়। এই পরিবর্তন ক্যানসারকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের গবেষকেরা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার কোষের এমন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের গবেষণায় MYC নামের একটি জিনের ভূমিকা উঠে এসেছে। সহজভাবে বললে, জিন কোষের বৃদ্ধি ও কাজের নির্দেশনা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। MYC-এর কার্যকলাপ বেড়ে গেলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও আক্রমণাত্মক আচরণের সঙ্গে এর সম্পর্ক দেখা যায়।
গবেষকেরা পরীক্ষাগারে MYC-এর কার্যকলাপ বাধাগ্রস্ত করে ক্যানসার কোষের আচরণে পরিবর্তন দেখেছেন। একই সঙ্গে কোষগুলোর আশপাশে রোগপ্রতিরোধী কোষের উপস্থিতিও বেড়েছে। তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া এই ফলাফল মানুষের শরীরে একইভাবে কাজ করবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু ক্যানসার কোষ কখনো কখনো এই ব্যবস্থাকে এড়িয়ে বেঁচে থাকে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার কোষে TIGIT নামের একটি জিনের কার্যকলাপ এবং রোগপ্রতিরোধী কোষের কাজ নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন ব্যবস্থার পরিবর্তন দেখা গেছে।
এ ছাড়া PD-1-সম্পর্কিত কার্যকলাপের পরিবর্তনও গবেষকদের নজরে এসেছে। এসব বিষয় বুঝতে পারলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে কাজে লাগানো চিকিৎসা কেন সব রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না, তা ব্যাখ্যা করা সহজ হতে পারে। ভবিষ্যতে এসব বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য করে নতুন চিকিৎসার পথও তৈরি হতে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় অস্পষ্ট হয়। তবে কয়েকটি উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন—
এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ক্যানসার হয়েছে, তা নয়। অন্য অনেক রোগেও এমন উপসর্গ দেখা যায়। তবে জন্ডিস, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা বিশেষ ধরনের অন্যান্য পরীক্ষা দিতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা এবং বায়োপসির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। CA 19-9 নামের একটি রক্তের মার্কারও কখনো ব্যবহার করা হয়। তবে এই পরীক্ষার ফল একা ক্যানসার নিশ্চিত করতে পারে না।
চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন, পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের সুযোগ থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি কিংবা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ক্যানসারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায় না। তবে ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, বয়স বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো বিষয় ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, তবে ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। ক্যানসার কোষ কীভাবে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বদলায়, চিকিৎসার পরও টিকে থাকে এবং শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে এড়িয়ে যায়—এসব বিষয় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।