স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫১ পি এম

আলঝেইমারসহ মস্তিষ্কের রোগে প্রদাহ কমানোর নতুন সম্ভাবনা

ছবি : সংগৃহীত

আলঝেইমার শুধু স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার রোগ নয়। এই রোগের সঙ্গে মস্তিষ্কের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহেরও সম্পর্ক রয়েছে।

এবার মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পথের সন্ধান পেয়েছেন, যেটিকে লক্ষ্য করে মস্তিষ্কের ক্ষতিকর প্রদাহ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

প্রদাহ আসলে কী?

শরীরের কোথাও আঘাত, সংক্রমণ বা কোষের ক্ষতি হলে সেটি মোকাবিলা করতে আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। আক্রান্ত স্থানে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং বিভিন্ন প্রতিরোধী কোষ ও রাসায়নিক সংকেত সেখানে কাজ শুরু করে। এর ফলে জায়গাটি লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া, গরম লাগা বা ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াকেই প্রদাহ বলা হয়।

প্রদাহ সবসময় খারাপ নয়। বরং শরীরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এটি প্রয়োজনীয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন কোনো কারণে এই প্রতিক্রিয়া দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে বা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়। তখন প্রদাহ নিজেই আশপাশের সুস্থ কোষ ও টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে।

মস্তিষ্কেও এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে মাইক্রোগ্লিয়া নামে বিশেষ ধরনের কোষ মস্তিষ্কের নিজস্ব ‘প্রতিরক্ষা কর্মী’ হিসেবে কাজ করে।মস্তিষ্কে আঘাত, কোষের ক্ষতি বা অন্য কোনো সমস্যা হলে মাইক্রোগ্লিয়া সক্রিয় হয়ে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

কিন্তু দীর্ঘস্থায়ীভাবে মাইক্রোগ্লিয়া অতিরিক্ত সক্রিয় থাকলে তারা বিভিন্ন প্রদাহজনিত রাসায়নিক সংকেত ছাড়তে পারে। এতে মস্তিষ্কের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়, যা স্নায়ুকোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

আলঝেইমারসহ বিভিন্ন নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন।

এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে P2X7 receptor। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের গবেষকরা নতুন গবেষণায় এই রিসেপ্টরের ভূমিকা পরীক্ষা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Brain জার্নালে।

গবেষকরা দেখেছেন, P2X7 receptor সক্রিয় হলে মাইক্রোগ্লিয়া ও মস্তিষ্কের অন্যান্য কোষ থেকে প্রদাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন রাসায়নিক বার্তাবাহক বা সাইটোকাইন নিঃসৃত হতে পারে। এর মধ্যে IL-1β নামের একটি সাইটোকাইন প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত।

গবেষকরা P2X7 receptor বন্ধ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট antagonist ব্যবহার করেন। মানুষের মস্তিষ্কের কোষ এবং নিউরোসার্জারির সময় পাওয়া জীবন্ত মস্তিষ্কের টিস্যুতে পরীক্ষা চালিয়ে তারা দেখতে পান, এই রিসেপ্টরকে বাধা দিলে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিজ্ঞানীরা শুধু ল্যাবরেটরিতে তৈরি কোষে পরীক্ষা চালাননি। নিউরোসার্জারির সময় চিকিৎসার প্রয়োজনেই অপসারণ করা মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যুও গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মানুষের মস্তিষ্কে এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করতে পারে, সে সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া গেছে।

তবে এই ফলাফলকে এখনই আলঝেইমারের নতুন চিকিৎসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। মানুষের রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন, যাতে বোঝা যায় P2X7 receptor লক্ষ্য করে চিকিৎসা করা বাস্তবে কতটা নিরাপদ ও কার্যকর।

গবেষকদের আশা, এই পথ ভবিষ্যতে শুধু আলঝেইমার নয়, পারকিনসন, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, আঘাতজনিত মস্তিষ্কের ক্ষতি এবং প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু স্নায়বিক সমস্যার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ, মস্তিষ্কের প্রদাহ তৈরির প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে শনাক্ত করে সেটিকে নিয়ন্ত্রণের যে সম্ভাবনা এই গবেষণায় দেখা গেছে, তা ভবিষ্যৎ চিকিৎসা গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তব চিকিৎসায় পরিণত হতে আরও গবেষণা ও মানবদেহে পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্যসূত্র : Medical xpress