স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
পুকুরের পানিতে ভেসে থাকা অতি ক্ষুদ্র এক ধরনের শৈবাল। বাইরে থেকে দেখলে যার মধ্যে বিশেষ কিছু নেই। অথচ এই শৈবাল কীভাবে আলো অনুভব করে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক প্রযুক্তির সন্ধান পেয়েছেন, যা বদলে দিয়েছে মস্তিষ্ক গবেষণার ধরন।
এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেল।
ঘটনার শুরু Chlamydomonas নামের এককোষী শৈবালকে নিয়ে। এই ক্ষুদ্র জীব আলো বুঝতে পারে এবং আলোর উপস্থিতি অনুযায়ী নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, এর কোষে channelrhodopsin নামের বিশেষ একটি প্রোটিন রয়েছে। এই প্রোটিন আলোকে ব্যবহার করে কোষের ভেতরে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে পারে।
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, একই ধরনের প্রক্রিয়া ব্যবহার করে মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরনকেও আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই প্রযুক্তির নাম অপটোজেনেটিক্স।
সহজ করে বললে, বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট কিছু নিউরনে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করান। এরপর মস্তিষ্কের সেই অংশে আলো ফেললে ওই নিউরনগুলো সক্রিয় করা যায়। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের হাজার হাজার কোষের ভিড়েও বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট কিছু কোষকে আলাদা করে ‘চালু’ বা ‘বন্ধ’ করে দেখতে পারেন।
এতে মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার নতুন দরজা খুলে গেছে।
কোন স্নায়ুকোষ স্মৃতি তৈরির সঙ্গে যুক্ত? কোনগুলো ঘুম, অনুভূতি বা চলাফেরায় ভূমিকা রাখে? নির্দিষ্ট কোষকে আলো দিয়ে সক্রিয় করে তার পরিণতি দেখার মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারছেন বিজ্ঞানীরা।
এর একটি চমকপ্রদ উদাহরণ পাওয়া যায় ইঁদুরের ওপর করা এক পরীক্ষায়। গবেষকেরা ইঁদুরের ভয়-সম্পর্কিত স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত কিছু নিউরন চিহ্নিত করেন। পরে অন্য পরিবেশে আলো দিয়ে ওই কোষগুলো সক্রিয় করা হলে ইঁদুর আবার ভয় পাওয়ার মতো আচরণ করে। এতে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের কোষকে কৃত্রিমভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।
তবে বিষয়টি শুধু গবেষণাগারেই আটকে নেই। ভবিষ্যতে চিকিৎসাতেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে রেটিনার কিছু রোগে অপটোজেনেটিক্স নিয়ে মানুষের ওপর প্রাথমিক পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। যেসব রোগীর চোখের আলো শনাক্তকারী রড ও কোন কোষ নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের অবশিষ্ট কোষকে আলো-সংবেদনশীল করে দৃষ্টিশক্তির কিছুটা ফিরিয়ে আনা যায় কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
পারকিনসনস রোগ, মৃগীরোগসহ বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যার চিকিৎসাতেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই নোবেলজয়ী আবিষ্কারের শুরু হয়েছিল কোনো জটিল চিকিৎসা সমস্যা থেকে নয়। একটি ছোট শৈবাল আলো দেখে কীভাবে সাঁতার কাটে, সেই সাধারণ কৌতূহল থেকেই। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা পৌঁছে গেছেন মানুষের মস্তিষ্কের গভীরে।যেখানে এখন আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সূত্র: মেডিকেল এক্সপ্রেস