স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ পি এম

লিভার ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রোটন থেরাপি নিয়ে বড় ট্রায়ালের ফল প্রকাশ

ছবি : সংগৃহীত

ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই এমন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে, যা ক্যানসারের কোষে নির্ভুলভাবে আঘাত করবে এবং আশপাশের সুস্থ কোষের ক্ষতি কমাবে। প্রোটন থেরাপি এমনই একটি আধুনিক রেডিয়েশন চিকিৎসা।

তবে উন্নত পর্যায়ের লিভার ক্যানসারে এই চিকিৎসা প্রচলিত রেডিয়েশনের চেয়ে রোগীদের বেশি দিন বাঁচাতে পারে কি না,নতুন একটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষণাটি করা হয়েছে হেপাটোসেলুলার কারসিনোমা (HCC) রোগীদের নিয়ে। এটি লিভার থেকে শুরু হওয়া ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরনগুলোর একটি।

প্রথমে জানা যাক, প্রোটন থেরাপি আসলে কী। ক্যানসারের রেডিয়েশন চিকিৎসায় সাধারণত ফোটন বা এক্স-রে ধরনের রশ্মি ব্যবহার করা হয়। একে ফোটন থেরাপি বলা হয়।অন্যদিকে প্রোটন থেরাপিতে প্রোটন কণা ব্যবহার করে টিউমারে রেডিয়েশন পৌঁছানো হয়। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে টিউমারের কাছে রেডিয়েশনের বড় অংশ পৌঁছে দিয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুতে তুলনামূলক কম রেডিয়েশন দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

এই সুবিধার কারণে কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে প্রোটন থেরাপি নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগ্রহ রয়েছে। তবে কোনো চিকিৎসা তাত্ত্বিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেই যে সেটি রোগীকে বেশি দিন বাঁচাবে, এমন নয়। সেটি প্রমাণ করতে বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন হয়।

নতুন NRG-GI003 Phase III ট্রায়ালে ১১৫ জন উন্নত পর্যায়ের HCC রোগী অংশ নেন। তাদের একদলকে প্রোটন থেরাপি এবং অন্যদলকে প্রচলিত ফোটন রেডিয়েশন দেওয়া হয়।

গবেষকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কোন চিকিৎসায় রোগীদের সামগ্রিকভাবে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখা যায় তা দেখা।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের অন্তর্বর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রোটন থেরাপি রোগীদের সামগ্রিক বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়নি।

দুই বছর পর প্রোটন থেরাপি নেওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ জীবিত ছিলেন। ফোটন থেরাপি নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ।

রোগের অগ্রগতি ঠেকানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। দুই বছর পর রোগের অগ্রগতি ছাড়া থাকার হার প্রোটন থেরাপিতে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ফোটন থেরাপিতে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল।

অর্থাৎ, এই গবেষণার ফলাফল থেকে বলা যাচ্ছে না যে উন্নত লিভার ক্যানসারে প্রোটন থেরাপি প্রচলিত ফোটন রেডিয়েশনের চেয়ে রোগীদের বেশি দিন বাঁচায়।

তবে গবেষণায় একটি সম্ভাব্য সুবিধা দেখা গেছে। গুরুতর চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রোটন থেরাপি নেওয়া রোগীদের মধ্যে কম ছিল।

প্রোটন থেরাপি গ্রুপে ১১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তৃতীয় গ্রেড বা তার বেশি মাত্রার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফোটন থেরাপি গ্রুপে এই হার ছিল ২৪ শতাংশ। তবে গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই পার্থক্যকে নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়নি।

তাই ফলাফলকে প্রোটন থেরাপি ‘ব্যর্থ’—এভাবে দেখাও ঠিক হবে না। গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে, উন্নত HCC রোগীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত রেডিয়েশনের তুলনায় প্রোটন থেরাপি বেঁচে থাকার সময় বাড়াতে পারেনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোন রোগীরা প্রোটন থেরাপি থেকে বেশি উপকার পেতে পারেন, তা খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

গবেষকদের মতে, শুধু রোগী কত দিন বাঁচছেন সেটিই নয়, চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রোগীর জীবনমান এবং সুস্থ টিস্যু কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসব বিষয়ও ভবিষ্যৎ গবেষণায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত। 

তাই আপাতত এই ট্রায়ালের মূল বার্তা হলো—প্রোটন থেরাপি আধুনিক ও সম্ভাবনাময় রেডিয়েশন পদ্ধতি হলেও উন্নত লিভার ক্যানসারে এটি প্রচলিত ফোটন থেরাপির তুলনায় বেশি দিন বাঁচার সুবিধা দেয় এমন প্রমাণ এই ট্রায়ালে পাওয়া যায়নি।