স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩০ পি এম

ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে নতুন চমক, বদলে গেল ধারণা!

ছবি : সংগৃহীত

ক্যানসারের একটি পরীক্ষাধীন ওষুধ এতদিন যে প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করে বলে মনে করা হচ্ছিল, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ওষুধটি ক্যানসার কোষে প্রভাব ফেলছে মূলত ভিন্ন একটি এনজাইমকে আটকে দিয়ে। এতে শুধু ওষুধটির কার্যপ্রণালি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে না, বরং এ ওষুধকে ঘিরে আগের কিছু গবেষণার ফলাফল এবং চলমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন গবেষণায় পরীক্ষাধীন ক্যানসার ওষুধ zavondemstat এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণামূলক যৌগ QC6352 নিয়ে এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Chemical Biology জার্নালে।

এই দুটি যৌগ কোলোরেক্টাল, অগ্ন্যাশয় ও প্রোস্টেট ক্যানসারসহ বিভিন্ন ক্যানসারের চিকিৎসায় সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ধারণা ছিল, এগুলো KDM4 নামের একদল প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে।

KDM4 এমন কিছু প্রোটিনের পরিবার, যেগুলো অতিরিক্ত সক্রিয় হলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও ছড়িয়ে পড়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে KDM4-কে বাধা দেওয়া গেলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমানো সম্ভব হতে পারে এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এসব যৌগ নিয়ে গবেষণা এগিয়েছে।

কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

গবেষকেরা দেখতে পান, QC6352 এবং zavondemstat-এর ক্যানসারবিরোধী প্রভাবের বড় অংশ আসলে DHODH নামের একটি এনজাইম বন্ধ করার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে।

DHODH কী?

সহজভাবে বললে, এটি কোষের ভেতরে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার অংশ, যা দ্রুত বিভাজিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান তৈরিতে সাহায্য করে। ক্যানসার কোষ দ্রুত বাড়তে ও নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে চায়। এ সময় তাদের নতুন DNA তৈরির জন্য প্রচুর উপাদান প্রয়োজন হয়। DHODH-এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে সেই প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজন ব্যাহত হতে পারে।

গবেষকেরা গ্লিওব্লাস্টোমা মস্তিষ্কের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ক্যানসারগুলোর একটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিষয়টি শনাক্ত করেন। রোগীর কাছ থেকে পাওয়া গ্লিওব্লাস্টোমা স্টেম সেল, টিউমার মডেল এবং বিভিন্ন জেনেটিক ও আণবিক পরীক্ষার মাধ্যমে তারা যৌগগুলোর কার্যপ্রণালি অনুসন্ধান করেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষকেরা যখন KDM4-কে লক্ষ্য করে তৈরি অন্য কিছু ইনহিবিটর পরীক্ষা করেন, তখন সেগুলো QC6352-এর মতো একই ধরনের ক্যানসারবিরোধী প্রভাব দেখায়নি। এতে তাদের সন্দেহ হয়, QC6352 হয়তো KDM4-কে বাধা দেওয়ার কারণেই ক্যানসার কোষে প্রভাব ফেলছে না।

পরবর্তী পরীক্ষায় তারা DHODH-কে ওই প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এটি ক্যানসার গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন?

কোনো ওষুধ শরীরে কোন লক্ষ্যবস্তুতে এবং কীভাবে কাজ করে, তা জানা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওষুধের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকলে সঠিক রোগী নির্বাচন, চিকিৎসার ফলাফল বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী গবেষণার নকশাতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

গবেষকদের মতে, QC6352-কে KDM4 গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। একই ধরনের ধারণার ভিত্তিতে zavondemstat ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেও এগিয়েছে। তাই নতুন ফলাফল আগের কিছু গবেষণার ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে zavondemstat কাজ করে না বা এটি ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে ব্যর্থ।এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বরং গবেষণাটি দেখাচ্ছে, ওষুধটি ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় কাজ করছে, সেটি আগের ধারণার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলই গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন এই তথ্য আবার DHODH-কে ক্যানসার চিকিৎসার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে গ্লিওব্লাস্টোমার মতো কঠিন মস্তিষ্কের ক্যানসারে DHODH বাধাগ্রস্ত করার ওষুধ ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসার পথ তৈরি করতে পারে কি না, সেটিও এখন গবেষণার বিষয়।

গবেষকেরা একই সঙ্গে এমন কিছু নতুন যৌগও তৈরি করেছেন, যেগুলো DHODH-কে প্রভাবিত না করে KDM4-কে আলাদাভাবে বাধা দিতে পারে। ভবিষ্যতে KDM4-এর প্রকৃত ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে এসব যৌগ গবেষকদের আরও নির্ভুলভাবে কাজ করতে সাহায্য করতে পারে।

সব মিলিয়ে, এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—ক্যানসারের কোনো সম্ভাব্য ওষুধ কতটা কার্যকর, তা জানার পাশাপাশি সেটি ঠিক কীভাবে কাজ করছে, সেটিও সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। কারণ ভুল কার্যপ্রণালির ওপর ভিত্তি করে গবেষণা এগোলে রোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নকশা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই প্রভাবিত হতে পারে।

সূত্র: মেডিকেল এক্সপ্রেস