স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
চীনের বিজ্ঞানীরা এমন এক ধরনের ‘স্মার্ট’ হাইড্রোজেল তৈরি করেছেন, যা আলো দিয়ে সক্রিয় করলে সময়ের সঙ্গে নিজের আকৃতি ও গঠন পরিবর্তন করতে পারে। শুধু আকৃতি বদলানো নয়, এই উপাদান জীবন্ত টিস্যুর মতো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও দেখিয়েছে।ভবিষ্যতে এটি চিকিৎসা, টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস এবং নমনীয় রোবট তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
গবেষকদের তৈরি ব্যবস্থাটির নাম STERS। এতে ব্যবহার করা হয়েছে তরল ধাতুর ক্ষুদ্র কণা। আলো প্রয়োগ করলে এসব কণা ধীরে ধীরে চলতে থাকা রাসায়নিক বিক্রিয়া তৈরি করে। সেই বিক্রিয়ার প্রভাবে হাইড্রোজেলের ভেতরের গঠন বদলাতে থাকে এবং পুরো উপাদানটি সময়ের সঙ্গে নতুন আকৃতি ধারণ করতে পারে।
এই পরিবর্তন খুব অল্প সময়ের মধ্যেও ঘটতে পারে, আবার দীর্ঘ সময় ধরেও চলতে পারে। গবেষকদের মতে, হাইড্রোজেলের এই ‘মরফোলজিক্যাল’ বা আকৃতিগত পরিবর্তন কয়েক মিনিট থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। শুধু একবার নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি একাধিকবার আকৃতি পরিবর্তন করতে সক্ষম। পরিবর্তনটি ক্ষুদ্র বা মাইক্রোস্কোপিক স্তর থেকে বড় বা ম্যাক্রোস্কোপিক স্তরেও ঘটানো সম্ভব বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
এই ধারণার পেছনে রয়েছে জীবন্ত প্রাণীর আচরণ। জীবন্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের গঠন বা আচরণ বদলে নেয়। যেমন স্পর্শ পেলে কিছু উদ্ভিদের পাতা গুটিয়ে যায়, আবার গিরগিটি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিজের রং পরিবর্তন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এমন অভিযোজনক্ষম বৈশিষ্ট্য কৃত্রিম উপাদানের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
চিকিৎসাক্ষেত্রে এর বড় সম্ভাবনা রয়েছে টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনর্গঠনের জন্য কৃত্রিম কাঠামো বা ‘স্ক্যাফোল্ড’ ব্যবহার করা হয়। ভবিষ্যতে এমন কোনো কাঠামো তৈরি করা গেলে, যা বেড়ে ওঠা জীবন্ত টিস্যুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে টিস্যু পুনর্গঠনের চিকিৎসা আরও উন্নত হতে পারে।
এটি রিজেনারেটিভ মেডিসিনেও সম্ভাবনাময়। এই চিকিৎসার লক্ষ্য হলো শরীরের নিজস্ব ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ও টিস্যুর কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা। পরিবর্তনশীল হাইড্রোজেল ভবিষ্যতে কোষের বৃদ্ধি ও নতুন টিস্যু তৈরির উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের সংকেত কম্পিউটার বা অন্য যন্ত্রে পাঠানো হয়। নমনীয় ও পরিবর্তনশীল উপাদান ব্যবহার করা গেলে মস্তিষ্কের মতো নরম টিস্যুর সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ আরও মানানসই করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সফট রোবটিকসেও এর ব্যবহার হতে পারে। জীবন্ত প্রাণীর মতো গঠন পরিবর্তন করতে সক্ষম উপাদান দিয়ে আরও নমনীয় রোবট তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে স্মার্ট ম্যাটেরিয়ালের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার মতো বাহ্যিক উদ্দীপনায় আকৃতি বদলানো ‘শেপ-মেমোরি অ্যালয়’ নিয়ে কাজ হয়েছে। নতুন হাইড্রোজেলের লক্ষ্য হলো আরও জীবন্ত ও সময়নির্ভর পরিবর্তনের ক্ষমতা তৈরি করা।
গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন চীনের বিজ্ঞানী Du Xuemin, যিনি Chinese Academy of Sciences-এর Shenzhen Institutes of Advanced Technology-তে স্মার্ট ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কাজ করছেন। গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউড Matter জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এই প্রযুক্তি এখনো গবেষণার পর্যায়ে। মানুষের শরীরে সরাসরি ব্যবহারের আগে এর নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং জীবন্ত টিস্যুর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আচরণ নিয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। তাই চিকিৎসায় এর বাস্তব প্রয়োগ এখনই নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।