স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১২ পি এম

রেটাট্রুটাইড: এক ইনজেকশনে ওজন কমবে প্রায় ২১ কেজি!

ছবি : সংগৃহীত

ডায়াবেটিস ও স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওজন কমানোর চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে পরীক্ষামূলক ওষুধ রেটাট্রুটাইড (Retatrutide)। সপ্তাহে একবার এই ইনজেকশন ব্যবহারে ৮০ সপ্তাহে শরীরের ওজন গড়ে প্রায় ২১ কেজি কমেছে। পাশাপাশি উন্নতি হয়েছে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও।

‘দ্য ল্যানসেট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে ওষুধটি এখনো পরীক্ষাধীন, সাধারণ ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়।

৮০ সপ্তাহে কমেছে প্রায় ২১ কেজি ওজন

গবেষণায় স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ১ হাজার ১৫২ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। তাঁদের ৮০ সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে একবার রেটাট্রুটাইডের বিভিন্ন মাত্রা অথবা প্লাসিবো দেওয়া হয়। প্লাসিবো হলো এমন একটি চিকিৎসা, যাতে পরীক্ষাধীন ওষুধের সক্রিয় উপাদান থাকে না।

ফলাফলে দেখা যায়, রেটাট্রুটাইডের সর্বোচ্চ ১২ মিলিগ্রাম মাত্রা গ্রহণকারীদের শরীরের ওজন গড়ে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। প্রাথমিক ওজনের ওপর নির্ভর করে এই হারে ওজন কমার পরিমাণ গড়ে প্রায় ২০ দশমিক ৭ কেজি হতে পারে। অন্যদিকে প্লাসিবো গ্রহণকারীদের ওজন কমেছে গড়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

যাঁদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩৫ বা তার বেশি ছিল, তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রার ওষুধ গ্রহণকারীদের ওজন গড়ে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।

তবে এই ফলাফল ৮০ সপ্তাহের চিকিৎসার পর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এটি একবার ইনজেকশন নিলেই ২১ কেজি ওজন কমে যাওয়ার বিষয় নয়।

তিনটি হরমোন রিসেপ্টরে কাজ করে ওষুধটি

রেটাট্রুটাইডের বিশেষত্ব হলো, এটি শরীরের তিনটি হরমোন রিসেপ্টরের ওপর একসঙ্গে কাজ করে। রিসেপ্টর হলো কোষের এমন অংশ, যার মাধ্যমে হরমোন শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।

ওষুধটি জিএলপি-১ (GLP-1) ও জিআইপি (GIP) হরমোনের কার্যক্রম অনুকরণ করে। এতে ক্ষুধা কমে, পেট ভরা থাকার অনুভূতি বাড়ে এবং ইনসুলিনের কার্যক্রমে সহায়তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি এটি গ্লুকাগন রিসেপ্টর সক্রিয় করে, যা শরীরের শক্তি ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।

বর্তমানে ব্যবহৃত সেমাগ্লুটাইড একটি হরমোন-সংশ্লিষ্ট পথ এবং টিরজেপাটাইড দুটি হরমোন-সংশ্লিষ্ট পথে কাজ করে। রেটাট্রুটাইডের তিনটি রিসেপ্টরে কাজ করার বৈশিষ্ট্যই একে আলাদা করেছে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও উন্নতি

পরীক্ষায় ওজন কমানোর পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা বোঝাতে ব্যবহৃত এইচবিএ১সি (HbA1c) রেটাট্রুটাইড গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৪ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। প্লাসিবো গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে কমেছে ০ দশমিক ৪৫ শতাংশ পয়েন্ট।

এ ছাড়া কোমরের মাপ, সিস্টোলিক রক্তচাপ এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও কমেছে। এসব পরিবর্তন ডায়াবেটিস ও স্থূলতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে

ওষুধটি ব্যবহারে কয়েকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব ও বমি উল্লেখযোগ্য। সর্বোচ্চ দুই মাত্রার ওষুধ গ্রহণকারীদের ৮ থেকে ১২ শতাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। প্লাসিবো গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫ শতাংশ।

গবেষকেরা মনে করছেন, স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় রেটাট্রুটাইড ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার ওপর প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, রেটাট্রুটাইড এখনো পরীক্ষাধীন ওষুধ। এটি সাধারণ ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি সংগ্রহ বা ব্যবহার করা উচিত নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও ওজন কমানোর জন্য বর্তমানে অনুমোদিত চিকিৎসা এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনই নিরাপদ পথ।