স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ পি এম

রাজধানীর ৮৫ শতাংশ বাসার পানিতে মলের জীবাণু

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিবারের ব্যবহারযোগ্য পানিতে মলবাহিত ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট এবং রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর পানিদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) প্রকাশিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফল এবং পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মূল্যায়নে এ চিত্র উঠে এসেছে।

ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অন্তত মৌলিক পানির সুবিধা পেলেও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা পান মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। পানির উৎস থেকে সংগৃহীত নমুনার ৪৭ শতাংশে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, পরিবহণ ও সংরক্ষণের বিভিন্ন ত্রুটির কারণে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের সময় দূষণের হার বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ।

ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া মলদূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। দূষিত পানি পান বা ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়রিয়া ও অন্যান্য অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য এ ধরনের দূষণ উদ্বেগজনক।

অন্যদিকে, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। ওয়ারপোর পর্যালোচনা অনুযায়ী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়ন এবং ৪ হাজার ৯১১টি মৌজার মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, ৪০টি উচ্চ এবং ৬৬টি মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে পানিসংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

সেচকাজে ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলাতেও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ওয়ারপোর মূল্যায়নে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, চারটি উচ্চ এবং পাঁচটি মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এ সংকটের অন্যতম কারণ।

এদিকে, রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানির মানও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। ওয়ারপো চারটি নদীর ৩৬টি স্থান থেকে চার মৌসুমে নমুনা সংগ্রহ করে ১৬টি সূচকে পানির গুণগত মান পরীক্ষা করেছে।

সংস্থাটির সমন্বিত পানির গুণগত মান সূচক অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ স্থানে নদীর পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে থাকে। বর্ষায় কিছুটা উন্নতি হলেও কোনো স্থানের পানির মান ‘চমৎকার’ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

গবেষণায় বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা মারাত্মকভাবে কম এবং জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এতে নদীতে জৈব দূষণের উচ্চমাত্রা এবং জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পকারখানা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও সাধারণ মানুষের ফেলা বর্জ্য নদীদূষণের অন্যতম উৎস। এসব বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে ফেলা বন্ধ করা না গেলে পানির মান উন্নত করা কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন নিয়ন্ত্রণ, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পানি পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বাসাবাড়িতে পানির দূষণ রোধে নিরাপদ উৎস থেকে পানি সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবহণ ও সংরক্ষণে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে পানির উৎস সুরক্ষা, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা এবং নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।