স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব তুলে ধরা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং এ-সংক্রান্ত সামাজিক স্টিগমা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে।
এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’।
এবারের প্রতিপাদ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বাণীতে বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণে সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কাউকে মানসিক সমস্যার কারণে অবহেলা বা বিচ্ছিন্ন না করে তাঁর কথা শুনতে হবে, পাশে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ থাকা মানে শুধু শারীরিকভাবে রোগমুক্ত থাকা নয়। মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও আবেগীয় ভালো থাকার বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত।
মানসিক সুস্থতা মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ মোকাবিলার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে সামগ্রিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত ভয়, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনে অনীহা দেখা দিলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এসব সমস্যার জন্য কাউকে দুর্বল বা অক্ষম মনে করা উচিত নয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, পরামর্শ ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কার্যকর ব্যবস্থাপনা সম্ভব।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামাজিক সংকোচ, কুসংস্কার, সচেতনতার অভাব, প্রশিক্ষিত জনবলের সীমাবদ্ধতা এবং সেবাপ্রাপ্তির অসুবিধার কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হন না।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পরিবারের কোনো সদস্য মানসিক সমস্যায় ভুগলে তাঁকে দোষারোপ না করে তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহমর্মিতা দেখানো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা উচিত।
একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বুলিং ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রত্যাশা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অনলাইন হয়রানি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব তাদের মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ জন্য অভিভাবক ও শিক্ষকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া। কোনো শিশু বা কিশোরের আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।
কর্মক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত কাজের চাপ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈষম্য এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যহীনতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
কর্মীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য আচরণ এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে কর্মদক্ষতা ও জীবনমান উন্নত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের তাৎপর্য শুধু এক দিনের সচেতনতামূলক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার সুযোগ বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে হবে।
মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, এমন কাউকে অবজ্ঞা না করে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তা পেতে সহযোগিতা করাই হতে পারে দিবসটির মূল শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।