স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:১১ পি এম

বিবাহের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা কেন জরুরি?

ছবি: সংগৃহীত

বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের মতে, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ, যা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিবাহপূর্ব স্ক্রিনিং ও সচেতনতা বৃদ্ধি।

এ বিষয়ে জনসচেতনতা না থাকায় প্রতি বছর দেশে অসংখ্য শিশু থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে, যা পরিবার ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, “থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়। এটি সম্পূর্ণ বংশগত রোগ। একজন ব্যক্তি বাহক (ক্যারিয়ার) হলেও সাধারণত তিনি সুস্থ জীবনযাপন করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই জানেন না যে তিনি থ্যালাসেমিয়া জিন বহন করছেন। কিন্তু দুইজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।”

তিনি জানান, থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্ত করার জন্য সাধারণ রক্ত পরীক্ষার পাশাপাশি বিশেষ কিছু পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে জানা সম্ভব একজন ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়া জিন বহন করছেন কি না। বিয়ের আগে এই পরীক্ষা করালে ভবিষ্যতে জন্ম নিতে যাওয়া সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে দম্পতি সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পাত্র ও পাত্রী উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে প্রতিটি গর্ভধারণে ২৫ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে যে সন্তান থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগে আক্রান্ত হবে। ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে সন্তান বাহক হবে এবং মাত্র ২৫ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ হবে। ফলে বাহক দুজনের মধ্যে বিয়ে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান বলেন, “থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশুদের বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত গ্রহণ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরপর রক্ত দিতে হয়। দীর্ঘদিন রক্ত নেওয়ার কারণে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যায়, যা হৃদযন্ত্র, লিভার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। ফলে রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট থ্যালাসেমিয়ার একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সবার নাগালের মধ্যে নয়। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো উপায়।”

চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে থ্যালাসেমিয়া বাহকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। দেশে লাখ লাখ মানুষ অজান্তেই এ রোগের বাহক হিসেবে জীবনযাপন করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহকদের কোনো উপসর্গ না থাকায় তারা নিজেদের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নন। ফলে বিবাহের পর সন্তান জন্মের মাধ্যমে রোগটি নতুন প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করানো মানেই বিয়ে বন্ধ করা নয়। বরং এটি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। যদি একজন বাহক হন এবং অন্যজন বাহক না হন, তাহলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তাই বিয়ের আগে উভয়ের পরীক্ষা করলে ঝুঁকি মূল্যায়ন সহজ হয়।

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান বলেন, “যেভাবে আমরা বিয়ের আগে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক বিষয় বিবেচনা করি, একইভাবে স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা ভবিষ্যতে একটি পরিবারকে আজীবনের কষ্ট ও বিপুল চিকিৎসা ব্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।”

তিনি তরুণ-তরুণী, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতি থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তার মতে, জাতীয় পর্যায়ে বিবাহপূর্ব থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা গেলে ভবিষ্যতে দেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাই সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করানো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।