স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৬ পি এম

ওজন কমানোর ইনজেকশন: স্বপ্ন নাকি নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি?

ছবি: সংগৃহীত

স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন এখন শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং এটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। এ কারণে দ্রুত ওজন কমানোর আশায় অনেকেই এখন ওজন কমানোর ইনজেকশনের দিকে ঝুঁকছেন।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সেলিব্রিটি ও ইনফ্লুয়েন্সারের প্রচারের ফলে এসব ইনজেকশন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এগুলো কোনো ‘জাদুকরী সমাধান’ নয়; বরং সঠিক রোগী নির্বাচন, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ছাড়া ব্যবহার করলে নানা জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সম্প্রতি দেশে ও বিদেশে ওজন কমানোর ইনজেকশন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, এসব ইনজেকশন কতটা নিরাপদ, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী, অবিবাহিত নারীদের জন্য এটি উপযুক্ত কি না এবং ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলে কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ওজন কমাতে যেসব ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই GLP-1 receptor agonist বা GLP-1/GIP-ভিত্তিক ওষুধ। এগুলো ক্ষুধা কমায়, পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার গতি ধীর করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি তৈরি করে। এর ফলে রোগী কম খাবার গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে ওজন কমতে শুরু করে। তবে এগুলো জীবনযাপনের পরিবর্তনের বিকল্প নয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এসব ইনজেকশন মূলত স্থূলতা বা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত। শুধুমাত্র কয়েক কেজি ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।

কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহারের শুরুতে অনেকের বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, বদহজম কিংবা পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ সাময়িক হলেও কারও কারও ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতাও হতে পারে।

বিরল হলেও অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ (প্যানক্রিয়াটাইটিস), পিত্তথলিতে পাথর বা গলব্লাডারের সমস্যা এবং তীব্র পেটব্যথার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ইনজেকশন নেওয়ার পর অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অবিবাহিত নারীরা কি নিতে পারবেন?

চিকিৎসকদের মতে, অবিবাহিত হওয়া বা বিবাহিত হওয়া-এটি এই ওষুধ ব্যবহারের প্রধান বিবেচ্য বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোগীর শারীরিক অবস্থা, ওজন, অন্যান্য রোগ এবং ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের পরিকল্পনা।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, এসব ইনজেকশন ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে সন্তান ধারণের ক্ষমতা নষ্ট করে-এমন প্রমাণ নেই। তবে গর্ভাবস্থায় বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে সাধারণত এসব ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। যারা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় আগে ওষুধ বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ইনজেকশন বন্ধ করলে কি ওজন আবার বাড়ে?

এটি সবচেয়ে বেশি করা প্রশ্নগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনজেকশন বন্ধ করার পর যদি আগের মতো অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং অলস জীবনযাপনে ফিরে যাওয়া হয়, তাহলে ওজন আবার বাড়তে পারে। কারণ ওষুধটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ওষুধ বন্ধ হওয়ার পর সেই প্রভাব কমে গেলে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলে পুনরায় ওজন বৃদ্ধি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তাই চিকিৎসকরা বলছেন, স্থায়ীভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই।

কারা এই ইনজেকশন ব্যবহার করবেন না?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং নির্দিষ্ট কিছু জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহার করা অনুপযুক্ত হতে পারে। এছাড়া যাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে নির্দিষ্ট ধরনের থাইরয়েড ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তাই ব্যবহারের আগে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য মূল্যায়ন জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওজন কমানোর ইনজেকশনকে অনেক সময় 'ম্যাজিক ওয়েট লস' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ সংগ্রহ করে ব্যবহার শুরু করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে অনলাইনে ভেজাল বা অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রির ঘটনাও উদ্বেগের কারণ।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর ইনজেকশন নির্দিষ্ট রোগীর জন্য কার্যকর চিকিৎসা হতে পারে, তবে এটি কোনো শর্টকাট নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইনজেকশন নেওয়া, অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

তাদের মতে, ওজন কমানোর সবচেয়ে নিরাপদ ও টেকসই উপায় হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসা গ্রহণ।

ওজন কমানোর লক্ষ্য অবশ্যই স্বাস্থ্যকর জীবন গড়ে তোলার জন্য হওয়া উচিত। তাই কোনো আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণের আগে এর উপকারিতা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জেনে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।