স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৫ পি এম

চুলকানি থেকে শ্বাসকষ্ট-উরটিকারিয়ার ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সতর্কবার্তা

ছবি: সংগৃহীত

শরীরে হঠাৎ তীব্র চুলকানি, লালচে ফোলা দাগ, চোখ বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া—এ ধরনের উপসর্গকে সাধারণ অ্যালার্জি ভেবে অবহেলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসক ডা. আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, এসব লক্ষণ অনেক সময় উরটিকারিয়া (Urticaria বা Hives)-এর প্রকাশ হতে পারে। আর রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে অ্যাঞ্জিওইডিমা (Angioedema) দেখা দেয়, যা গলা ফুলে শ্বাসনালিতে বাধা সৃষ্টি করে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সম্প্রতি জনসচেতনতামূলক এক বার্তায় নিজের চিকিৎসা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ডা. আব্দুর রহমান জানান, একদিন তাঁর চেম্বারে এক রোগী গুরুতর অবস্থায় আসেন। রোগীর গলায় ফোলা, চোখ-মুখ ফুলে যাওয়া এবং শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হচ্ছিল। রোগী জানান, কিছুক্ষণ আগেও তাঁর সারা শরীরে প্রচণ্ড চুলকানি ও লালচে ফোলা দাগ উঠেছিল। পরে দাগগুলো মিলিয়ে গেলেও শুরু হয় গলা ফুলে যাওয়ার সমস্যা এবং শ্বাসকষ্ট। রোগীর উপসর্গ দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়।

চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, উরটিকারিয়া হলো ত্বকের একটি সাধারণ কিন্তু অনেক সময় জটিল অ্যালার্জিজনিত সমস্যা। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ চুলকানিযুক্ত লালচে বা সাদা ফোলা দাগ দেখা দেয়। এসব দাগ সাধারণত কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিলিয়ে যায়, তবে আবার শরীরের অন্য স্থানে নতুন করে দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্বকের পাশাপাশি চোখের পাতা, ঠোঁট, জিহ্বা কিংবা গলা ফুলে যায়, যা অ্যাঞ্জিওইডিমা নামে পরিচিত।

তিনি বলেন, অ্যাঞ্জিওইডিমার কারণে যদি গলা বা শ্বাসনালি ফুলে যায়, তাহলে রোগীর শ্বাস নিতে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। এমন পরিস্থিতি জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে। তাই শ্বাসকষ্ট, গলা ফুলে যাওয়া কিংবা কথা বলতে অসুবিধা হলে কোনোভাবেই সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

চিকিৎসকের মতে, উরটিকারিয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে চিংড়ি, ইলিশ, গরুর মাংস, ডিম, বাদাম বা অন্যান্য খাবারে অ্যালার্জির কারণে এ সমস্যা হয়। আবার ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর কারণ হতে পারে। ধুলাবালি, ঠান্ডা বা অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া, সূর্যের তীব্র আলো, মশা বা বিভিন্ন পোকার কামড়, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও উরটিকারিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে অনেক সময় সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে আইডিওপ্যাথিক উরটিকারিয়া বলা হয়।

ডা. আব্দুর রহমান জানান, রোগটির প্রধান উপসর্গ হলো হঠাৎ তীব্র চুলকানি, লালচে বা সাদা ফোলা দাগ, ত্বকে জ্বালাপোড়া এবং কিছু ক্ষেত্রে হালকা জ্বরের অনুভূতি। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো চোখ, ঠোঁট বা গলা ফুলে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে তিনি কয়েকটি পরামর্শ দেন। যেসব খাবার বা ওষুধে অ্যালার্জির সমস্যা হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ, যেমন সিট্রিজিন বা লোরাটাডিন ব্যবহার করা যেতে পারে। আক্রান্ত স্থানে ঠান্ডা বা বরফের সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায়। পাশাপাশি শরীর ঠান্ডা রাখা, অতিরিক্ত ঘাম এড়িয়ে চলা, ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। যদিও শুধু বেশি পানি পান করলেই অ্যালার্জির উপাদান শরীর থেকে বেরিয়ে যায়—এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই পানি পান উপকারী হলেও উরটিকারিয়ার চিকিৎসার বিকল্প নয়।

চিকিৎসকের মতে, যদি টানা ছয় সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে উরটিকারিয়ার উপসর্গ থাকে, তাহলে সেটিকে দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক উরটিকারিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে রোগের কারণ নির্ণয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হতে পারে।

ডা. আব্দুর রহমান বলেন, “উরটিকারিয়া শুধু ত্বকের একটি সাময়িক সমস্যা নয়। অনেক সময় এটি শরীরের ভেতরের অ্যালার্জি বা অন্য কোনো সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়। তাই উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।”

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও মত, অ্যালার্জিজনিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সম্ভাব্য ট্রিগার এড়িয়ে চলা এবং গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে উরটিকারিয়া ও এর জটিলতা থেকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।