স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে দাদ বা ছত্রাকজনিত (ফাঙ্গাল) ত্বকের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আবহাওয়া নয়; অপরিচ্ছন্নতা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি না মানা, সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত মলমের অবাধ ব্যবহার এই রোগের বিস্তারের প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাদ সাধারণত প্রাণঘাতী নয়। তবে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়ে, বারবার ফিরে আসে এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দাদ মূলত এক ধরনের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ। গরম ও আর্দ্র পরিবেশে ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই বগল, কুঁচকি, ঘাড়, স্তনের নিচে এবং পায়ের আঙুলের ফাঁকের মতো ভেজা স্থানে এ সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ঘামযুক্ত কাপড় পরে থাকা, অপরিষ্কার পোশাক ব্যবহার এবং অন্যের তোয়ালে, গামছা বা ব্যক্তিগত সামগ্রী ব্যবহার করলেও সংক্রমণ সহজেই একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডায়াবেটিস, অপুষ্টি, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবন, ঘুমের অভাব এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলে দাদের সংক্রমণ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ স্টেরয়েডযুক্ত মলমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। চুলকানি হলেই অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বেটনোভেট, ক্লোবেটাসল বা এ ধরনের স্টেরয়েডসমৃদ্ধ মলম ব্যবহার করেন। এতে সাময়িকভাবে চুলকানি কমলেও ছত্রাক পুরোপুরি নির্মূল হয় না; বরং আরও বিস্তার লাভ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে টিনিয়া ইনকগনিটো (Tinea Incognito) বলা হয়, যেখানে রোগটি আড়ালে থেকে আরও জটিল আকার ধারণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্টেরয়েড ব্যবহার বন্ধ করা গেলে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান সহায়ক হতে পারে। নিমের অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান, রসুনের অ্যালিসিন, নারকেল তেলের লরিক ও ক্যাপ্রিলিক অ্যাসিড এবং হলুদের কারকিউমিন ছত্রাকের বৃদ্ধি কমাতে ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এগুলো কখনোই মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়।
দাদ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। আক্রান্ত স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে রাখা, ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরা, আলাদা তোয়ালে ব্যবহার করা এবং ঘামযুক্ত কাপড় দ্রুত পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ নুরুল আলম বলেন, "বর্তমানে আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ধরনের দাদের রোগী পাচ্ছি। এর অন্যতম প্রধান কারণ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত মলম ব্যবহার। এসব মলমে সাময়িকভাবে চুলকানি কমে যাওয়ায় রোগীরা মনে করেন তারা সুস্থ হয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে ছত্রাক ত্বকের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।"
তিনি বলেন, "দাদ একটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ। তবে রোগীকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ বা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। একই সঙ্গে আক্রান্ত স্থান সবসময় পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখতে হবে, প্রতিদিন পরিষ্কার সুতি পোশাক পরতে হবে এবং অন্যের তোয়ালে, গামছা বা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।"
ডাঃ মোঃ নুরুল আলম আরও বলেন, "ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে দাদকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বা বারবার ফিরে এলে অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিক চিকিৎসাই দাদ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।"