স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহারের মাধ্যমে ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA)। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও বলছেন, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোক প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ উচ্চ রক্তচাপই স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ ১৩০/৮০ mmHg-এর নিচে রাখার চেষ্টা করা উচিত। পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, কারণ দীর্ঘদিন রক্তে অতিরিক্ত শর্করা থাকলে রক্তনালীর ক্ষতি হয় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য, ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এছাড়া রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল রক্তনালীর ভেতরে চর্বি জমিয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করে স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। তাই অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ ১,৫০০ মিলিগ্রামের (প্রায় অর্ধেক চা-চামচ) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, গোটা শস্য এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফাস্টফুড, প্রসেসড মাংস, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত এবং অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম স্ট্রোক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা কিংবা সাইকেল চালানোর মতো মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করলে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। পাশাপাশি শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোও জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের ওজন মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমালেও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞরা পর্যাপ্ত ঘুমের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। যাদের অতিরিক্ত নাক ডাকার সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে, তাদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণভাবে বর্জনের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ ধূমপান রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়, যা স্ট্রোকের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মানসিক চাপও রক্তচাপ বাড়িয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তাই নিয়মিত ধ্যান, যোগব্যায়াম, শরীরচর্চা অথবা পছন্দের কোনো সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়ার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, স্ট্রোক প্রতিরোধে সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত শারীরিক সক্রিয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঠিক ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাদের ভাষায়, জীবনযাপনে ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনই ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে।