স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
কোনো কোনো যাত্রা শুধু এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছানোর গল্প নয়। কিছু যাত্রা হয়ে ওঠে দায়িত্ব, মানবতা এবং অদম্য নিষ্ঠার প্রতীক। ভারতের মণিপুর রাজ্যের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের এক স্বাস্থ্যকর্মী মেইদিনলিউ নিউমাইয়ের গল্পও ঠিক তেমনই।
মাত্র ১৭ জন শিশুর কাছে পোলিও টিকা পৌঁছে দিতে তিনি প্রায় ২৮ কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন। ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি পথ, পাঁচটি নদী আর প্রায় আট ঘণ্টার কঠিন যাত্রা পেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মণিপুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও এর অনেক এলাকা আজও যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকে পিছিয়ে। বিশেষ করে তামেংলং জেলার পাহাড়ি গ্রামগুলোতে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অনেক জায়গায় পাকা সড়ক নেই, বর্ষার সময় নদী পার হওয়াও হয়ে পড়ে বিপজ্জনক। এমনই এক প্রত্যন্ত এলাকা নেনলুং আতাংখুলেন, যেখানে বসবাসকারী শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় পোলিও টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে মেইদিনলিউ নিউমাইয়ের দায়িত্ব পড়ে ওই গ্রামে টিকা পৌঁছে দেওয়ার। একটি কুলিং বক্সে পোলিওর টিকা বহন করতে হয়।
কারণ নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় না থাকলে টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পুরো যাত্রাজুড়েই টিকা নিরাপদ রাখা ছিল তার অন্যতম বড় দায়িত্ব।
পিঠে নিজের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আর মাথায় টিকার কুলিং বক্স নিয়ে তিনি সকালেই রওনা দেন। সামনে ছিল প্রায় ২৮ কিলোমিটারের পথ। সেই পথে ছিল ঘন বন, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা, কাদা, পাথর আর পাঁচটি নদী।
কোথাও বাঁশের সাঁকো, কোথাও হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে এগোতে হয়েছে। পুরো যাত্রায় লেগেছে প্রায় আট ঘণ্টা। কিন্তু একবারের জন্যও তিনি ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেননি।
তার কাছে এই যাত্রা ছিল না কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয়। তার একটাই লক্ষ্য ছিল, শুধু দূরত্বের কারণে যেন একটি শিশুও পোলিও টিকা থেকে বঞ্চিত না হয়।
অবশেষে দিনের শেষে তিনি পৌঁছান নেনলুং আতাংখুলেন গ্রামে। সেখানে অপেক্ষা করছিল ১৭টি শিশু ও তাদের পরিবার। একে একে প্রতিটি শিশুর মুখে পোলিওর ড্রপ তুলে দেন তিনি।
হয়তো সংখ্যাটি মাত্র ১৭। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ১৭ জন শিশুর নিরাপত্তাই একটি পুরো সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বহুবার বলেছেন, পোলিও নির্মূল কর্মসূচিতে একজন শিশুও বাদ পড়া উচিত নয়। কারণ কোনো এলাকায় একজন শিশুও যদি টিকাবঞ্চিত থাকে, তাহলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। সেই বাস্তবতাই মেইদিনলিউ নিউমাইকে অনুপ্রাণিত করেছে অসম্ভবকে সম্ভব করতে।
তবে এই ঘটনা তার জীবনের এক দিনের গল্প মাত্র। মেইদিনলিউ নিউমাই ২০০৭ সাল থেকে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সঙ্গে যুক্ত থেকে তামেংলং জেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাশে আছেন।
শুধু টিকাদান নয়, তার দায়িত্বের পরিধি আরও অনেক বড়। তিনি স্থানীয় মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতন করেন। গর্ভবতী মায়েদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন, প্রসূতি সেবায় সহায়তা করেন এবং শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে পরিবারগুলোকে উদ্বুদ্ধ করেন। অনেক সময় রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থাও করেন।
দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ শহরের স্বাস্থ্যসেবার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। সেখানে বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে একটি টিকা, একটি ওষুধ বা একজন স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিই জীবন বাঁচানোর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। সেই বাস্তবতায় মেইদিনলিউয়ের মতো কর্মীরা নীরবে মানুষের পাশে থেকে কাজ করে চলেছেন।
তার এই ২৮ কিলোমিটারের পদযাত্রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে প্রশংসা শুরু হয়। অনেকেই তাকে ‘রিয়েল হিরো’ বা প্রকৃত নায়ক বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার জন্য নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাসে এমন অসংখ্য অজানা নায়ক রয়েছেন, যাদের নাম হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে না। কিন্তু তাদের নিরলস পরিশ্রমের কারণেই টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়, মাতৃমৃত্যু কমে, শিশু সুস্থ থাকে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পায়।
মেইদিনলিউ নিউমাই সেই অজানা নায়কদেরই একজন, যার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জনস্বাস্থ্য কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে না; এর পেছনে মাঠপর্যায়ের অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষের ঘাম, পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ জড়িয়ে থাকে।
আজ যখন বিশ্বের অনেক দেশ পোলিও নির্মূলের সাফল্য ধরে রাখতে কাজ করছে, তখন মেইদিনলিউ নিউমাইয়ের মতো স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদান আরও বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ একটি টিকার ড্রপ শুধু একটি শিশুকে রোগ থেকে রক্ষা করে না, বরং একটি সমাজকে নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেয়।
১৭ শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দিতে ২৮ কিলোমিটার হাঁটার এই গল্প তাই শুধু একটি স্বাস্থ্যকর্মীর সাহসিকতার কাহিনি নয়; এটি দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এমন মানুষদের কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম জনপদেও আশার আলো পৌঁছে যায়, আর স্বাস্থ্যসেবা হয়ে ওঠে সবার অধিকার