স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
কিডনি মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে বের করা, শরীরের লবণ-পানির ভারসাম্য রক্ষা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়ক হরমোন উৎপাদনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease-CKD) অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে পারে। ফলে অনেক রোগী রোগটি ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত বুঝতেই পারেন না যে তাদের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন এবং জীবনযাত্রার নানা কারণে অল্প বয়সীদের মধ্যেও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই শুধু বয়স্কদের নয়, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদেরও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি।
নেফ্রোলজিস্টদের মতে, দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালিকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন এবং নির্ধারিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, কিছু ব্যথানাশক ওষুধ, বিশেষ করে NSAID-জাতীয় ওষুধ (যেমন ডাইক্লোফেনাক, কেটোরোলাক, আইবুপ্রোফেন ইত্যাদি) দীর্ঘদিন বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করলে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। একইভাবে কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই যেকোনো ওষুধ নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পর্যাপ্ত পানি পান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কতটুকু পানি প্রয়োজন, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং হৃদরোগ বা কিডনি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয় ও ফাস্টফুড বেশি খাওয়া উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা পরোক্ষভাবে কিডনির ওপরও প্রভাব ফেলে।
চিকিৎসকদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে কিডনি রোগ হয়েছে, এমন নয়। আবার অনেক কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণও নাও থাকতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা, পরিবারের কারও কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে বা বয়স বাড়ছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা উচিত।
কিডনি মূল্যায়নে সাধারণত Serum Creatinine, eGFR এবং Urine Albumin-to-Creatinine Ratio (ACR) গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপও জরুরি।
নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হয়, তাহলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই ধীর করা সম্ভব। এতে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘ সময় পিছিয়ে দেওয়া বা কিছু ক্ষেত্রে এড়ানোও সম্ভব হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি আমাদের শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যা নীরবে প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যায়। তাই কোনো উপসর্গের অপেক্ষা না করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই কিডনি সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।