স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষ শুধু ক্লান্ত বা অবসন্নই হয় না, এর প্রভাব পড়তে পারে মস্তিষ্কের গভীর স্তরেও। সাম্প্রতিক গবেষণার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে সুস্থ নিউরনের সংযোগও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গবেষকেরা রূপক অর্থে এই অবস্থাকে মস্তিষ্কের এক ধরনের ‘সুইসাইডাল’ বা আত্মধ্বংসী প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এটি কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নয়; বরং মস্তিষ্কের নিজের টিস্যুর ওপর অতিরিক্ত ক্ষতিকর প্রভাব বোঝাতে ব্যবহৃত একটি বর্ণনামূলক শব্দ।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের মস্তিষ্কে থাকা গ্লিয়াল (Glial) কোষ সাধারণত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো কাজ করে। এসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত নিউরন, অপ্রয়োজনীয় সংযোগ এবং বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণ করে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হন, তখন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই ভারসাম্য হারাতে শুরু করে।
বিশেষ করে অ্যাস্ট্রোসাইট (Astrocyte) নামের এক ধরনের গ্লিয়াল কোষ ঘুমের অভাবে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন তারা শুধু নষ্ট বা অকার্যকর অংশই নয়, বরং সুস্থ ও কার্যকর সিন্যাপস (Synapse) বা নিউরনের সংযোগও অপসারণ করতে শুরু করে। ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ইঁদুরের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রাণীকে দীর্ঘ সময় গভীর ঘুম থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে এই অতিসক্রিয় পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়ার ফলে প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কোষীয় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্কের জন্য শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণও হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাইক্রোগ্লিয়া (Microglia) নামের আরেক ধরনের গ্লিয়াল কোষও ঘুমের অভাবে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই কোষগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। তবে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে গেলে এগুলো প্রদাহ (Inflammation) বাড়াতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে নিউরনের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ গবেষণার ফলাফল আলঝেইমার ও অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এসব রোগে প্রায়ই ঘুমের ব্যাঘাত, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং নিউরনের ক্ষয় একসঙ্গে দেখা যায়। ঘুমের অভাবের কারণে মস্তিষ্কের অতিসক্রিয় পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা এই রোগগুলোর অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে এখন আরও গবেষণা চলছে।
তবে গবেষকেরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এ গবেষণা ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার প্রভাব রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাবে না। মানুষের মস্তিষ্ক অনেক বেশি জটিল হওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
চিকিৎসক ও ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিয়মিত ভালো ঘুম স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, মানসিক ভারসাম্য এবং মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুমের প্রয়োজন হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমানোর আগে মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমানো, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং শান্ত পরিবেশে ঘুমানোর অভ্যাস ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে সহায়ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ পর্যাপ্ত ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেয় না, এটি মস্তিষ্ককে নিজেকে মেরামত করারও সুযোগ করে দেয়। আর সেই সুযোগ দীর্ঘদিন না পেলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যবস্থাই উল্টো তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।