স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগ নির্ণয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অথচ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের তীব্র সংকটে ব্যাহত হচ্ছে রোগ নির্ণয়সেবা।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র আট হাজারের মতো।
দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় নিয়োগ না হওয়ায় সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত রয়েছে। ফলে রোগীদের নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ওপর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলে রোগীরা কম খরচে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়বে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের আশপাশে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা বাড়লেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর সুযোগ পর্যাপ্ত নয়।
ফলে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মান ও রিপোর্টের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
ভুল বা মানহীন রিপোর্টের কারণে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়সেবার অভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী জাতীয় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পরিষদের মহাসচিব মো. রিপন শিকদার বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন প্রায় আট হাজার। তাঁর অভিযোগ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ হচ্ছে না।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্ট নিয়োগ ছাড়া সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাগারসেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
বৈষম্যবিরোধী জাতীয় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পরিষদের সভাপতি মো. আব্দুস সামাদ বলেন, সরকার এখন ৪০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিলে মাসে বেতন বাবদ ব্যয় হবে আট কোটি টাকার মতো। তাঁর দাবি, বিপরীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে প্রতি মাসে সরকারের প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতে পারে। তবে এ হিসাবের ভিত্তি ও বাস্তবসম্মততা যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে আইনি জটিলতার ইতিহাস রয়েছে। ২০১৩ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্টদের করা মামলার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
পরে মামলাটি নিষ্পত্তি হলেও নিয়োগ কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পায়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতায় সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে গবেষণার তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির বাজার ১৮০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তাঁদের মতে, সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাগারগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল দিয়ে সচল করা গেলে রোগীদের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতাও বাড়ানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, প্রেসক্রিপশন, রোগী ভর্তি, শয্যা, মেঝেতে রোগীর অবস্থান এবং অস্ত্রোপচারসহ স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ধাপ থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ বিনামূল্যে রোগীর কাছে পৌঁছানোকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল উন্নীত করার প্রক্রিয়াও দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দশকের বেশি সময় ধরে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। টেকনোলজিস্টদের চাকরি দশম গ্রেডে উন্নীতকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে সরকার।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তবে শুধু জনবল নিয়োগ করলেই হবে না; পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি সচল রাখা, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও উপকরণ সরবরাহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, সরকারি হাসপাতালের রোগ নির্ণয়সেবা শক্তিশালী করা গেলে রোগীরা কম খরচে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর সুযোগ পাবেন।
এতে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব কমানো, চিকিৎসার যথার্থতা বাড়ানো এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। দীর্ঘদিনের নিয়োগ জটিলতা কাটিয়ে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।