স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহৃত ব্যাটারি ভাঙা, পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনস্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি অনিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হলে বিষাক্ত সিসা মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
এর প্রভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও স্নায়ুতন্ত্র। দীর্ঘমেয়াদে এ দূষণ জনস্বাস্থ্য এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু, যার সংস্পর্শ মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি বেশি। কারণ, শৈশবে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত বিকশিত হয়। এ সময়ে সিসার সংস্পর্শ শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও আচরণগত বিকাশে সমস্যা তৈরি করতে পারে। উচ্চমাত্রার সংস্পর্শে গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল রয়েছে। মেয়াদ শেষ হলে এসব ব্যাটারি মেরামত বা পুনর্ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু এ কাজে যথাযথ প্রযুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিবেশগত নিয়ম অনুসরণ না করা হলে ব্যাটারির সিসাযুক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর সময় তৈরি হওয়া ধুলা ও ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাটারির বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে দিলে মাটি ও পানিতে সিসা মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দূষিত মাটি, পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে সিসা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শ্বাসের সঙ্গে সিসাযুক্ত ধুলা গ্রহণ কিংবা দূষিত হাত মুখে দেওয়ার মাধ্যমেও শরীরে এটি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে অনিরাপদ ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার বাসিন্দারাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
চিকিৎসকদের মতে, সিসার সংস্পর্শের ক্ষতিকর প্রভাব সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। কোনো শিশুর শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তার পেছনে পরিবেশগত দূষণের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নির্ণয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দূষণের উৎস শনাক্ত করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “সিসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি, কারণ তাদের শরীর ও মস্তিষ্ক তখনো বিকাশের পর্যায়ে থাকে। ব্যাটারি ভাঙা ও পুনর্ব্যবহারের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে সিসা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ব্যবহৃত ব্যাটারি যেখানে-সেখানে ফেলা বা অনিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত করা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
জনস্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি সিসা দূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। শিশুদের বিকাশ ও শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তাদের শিক্ষাগত অর্জন এবং কর্মদক্ষতা প্রভাবিত হতে পারে।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। তবে দেশে সিসা দূষণের কারণে কত শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিংবা অর্থনীতিতে ঠিক কত টাকার ক্ষতি হচ্ছে, তা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহারের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ব্যাটারি বর্জ্য অনুমোদিত ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে।
অনিরাপদভাবে ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের ধরন, মাটি ও পানিতে সিসার উপস্থিতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের সিসার সংস্পর্শ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে দূষণের উৎস চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অনেক মানুষের জীবিকা ও যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত। তাই এ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোও জরুরি।
নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, কার্যকর নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে সিসা দূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। শিশুদের সুস্থ বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এখনই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।