স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: একটি ফাইলের যাত্রা যেন শেষই হচ্ছে না। কখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কখনো জনপ্রশাসন, আবার কখনো অর্থ বিভাগ-এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের প্রস্তাব। চিঠি যাচ্ছে, তথ্য চাওয়া হচ্ছে, বৈঠক হচ্ছে, তাগিদ দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আর আসছে না।
মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেডের দাবি চলে আসছে তিন দশকের বেশি সময় ধরে। ফার্মাসিস্টদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির পর ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বরও প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে তাগিদ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের নথিপত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পদ ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে গঠিত কমিটি এ পদগুলো উন্নীত করার পক্ষে মতামত দেয়।
এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২০ মে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
নথিপত্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৩ জানুয়ারি অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ আর্থিক সংশ্লেষ সম্পর্কে মতামতের পাশাপাশি কিছু তথ্য চায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ জানুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ অধিশাখা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়। পরে ২ ফেব্রুয়ারিও পুনরায় তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একই বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও পাঠানোর প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ হচ্ছে কেন? মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার চিঠি ও তাগিদ দেওয়ার পরও তথ্য সরবরাহে বিলম্বের কারণ কী? সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিলম্বের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
এর মধ্যেই বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস উপলক্ষে গত ২ অক্টোবর রাজধানীর মহাখালীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফার্মাসিস্টদের ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নিতে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ফাইল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার।
তিনি বলেন, ফার্মাসিস্টদের ১০ম গ্রেডের উদ্যোগ বিএনপি সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তারা এ দাবিতে আন্দোলন করছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও অধিদপ্তরের উদাসীনতার কারণে বিষয়টি বাস্তবায়ন হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্যোগী হলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফাইল এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
একই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাসিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তাদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ফার্মাসিস্টদের ১০ম গ্রেডের দাবি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্টদের কিছুটা সময় দেওয়ার আহ্বান জানান। যৌক্তিক দাবি পূরণে সরকারের শতভাগ ইচ্ছা রয়েছে, তবে এজন্য সময় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জনপ্রশাসন বিধি অনুবিভাগের চেকলিস্ট অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সৃজনকৃত পদ ৫ হাজার ৪২৭টি। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি ২ হাজার ৫২৩, রেডিওলজি ৮৯৪, ডেন্টাল ৬৫৯, ফিজিওথেরাপি ৪৫৭ এবং রেডিওথেরাপির ৮৯৪টি পদ রয়েছে। ফার্মাসিস্টের সৃজনকৃত পদ ২ হাজার ৯৫১টি। দুই পেশা মিলিয়ে সৃজনকৃত পদ ৭ হাজার ৭১৯টি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন নিয়োগের বিষয়টিও একই কাঠামোর আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১১তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগযোগ্য মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের শূন্য পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যমান কর্মীদের গ্রেড উন্নীত না করেই নতুন নিয়োগ একই গ্রেডে হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফার্মাসিস্টদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অন্যান্য পেশার কর্মীদের উচ্চশিক্ষা ও পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে এসব সুযোগ সীমিত। নার্সদের ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন হলেও একই পর্যায়ে যোগদানকারী ফার্মাসিস্টরা এখনো এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে ১০ম গ্রেডের ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ ও ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগের সঙ্গে ফার্মাসিস্টের পদসংখ্যা সমন্বয়ের দাবি উঠেছে। ড্যাবের কোষাধ্যক্ষ ডা. মো. মেহেদী হাসান বলেন, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আনুপাতিক হারে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিতে হবে।
পেশাজীবীদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও নতুন পদ সৃষ্টির বদলে বিদ্যমান পদ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও রোগীর সেবা ব্যাহত করতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমটিএ) সভাপতি খাজা মাইনউদ্দীন বলেন, ৫ আগস্টের পর ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন নিয়ে পেশাজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বাস্তবায়িত না হওয়া হতাশাজনক।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা স্বাস্থ্যসেবার রোগ নির্ণয়, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, রেডিওলজি, রেডিওথেরাপি, ওষুধ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত। ফলে তাদের গ্রেড, পদোন্নতি ও জনবল কাঠামোর প্রশ্নটি শুধু চাকরিজীবীদের দাবি নয়; এর সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত।
এ অবস্থায় দীর্ঘদিনের দাবিটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক তথ্য দ্রুত নিষ্পত্তি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্তের দাবি জানাচ্ছেন পেশাজীবীরা।