স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৬ এএম

৪০ হাজার টেকনোলজিস্ট নিয়োগে মাসে দেড় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের হাতছানি

ছবি: প্রতীকী

ঢাকা: দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৪০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলে মাসে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা।

তাঁদের দাবি, এ ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্তদের মাসিক বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় হবে আট কোটি টাকারও কম।

অথচ দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ থাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে রোগীদের নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ওপর।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দেড় লাখের বেশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আট হাজারের মতো।

দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।

এতে রোগীদের একদিকে যেমন বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ধরন ও জটিলতা নির্ধারণ থেকে শুরু করে চিকিৎসার কার্যকারিতা মূল্যায়ন, সব ক্ষেত্রেই পরীক্ষাগারসেবার ভূমিকা রয়েছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সরকারি হাসপাতালের অনেক পরীক্ষাগারে বিদ্যমান সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

বৈষম্যবিরোধী জাতীয় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পরিষদের সভাপতি মো. আব্দুস সামাদ বলেন, সরকার এই মুহূর্তে ৪০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিলে মাসিক বেতন বাবদ ব্যয় হবে মাত্র আট কোটি টাকা। বিপরীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব বলে তিনি দাবি করেন।

সংগঠনটির মহাসচিব মো. রিপন শিকদার বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে আছেন মাত্র আট হাজারের মতো। সরকারি ও বেসরকারি খাতের নানা জটিলতার কারণে প্রয়োজনীয় নিয়োগ হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের আশপাশে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার ঘটলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।

ফলে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মান ও রিপোর্টের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

গবেষণার তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির বাজার ১৮০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।

তাঁদের মতে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং মানসম্মত পরীক্ষাগার নিশ্চিত করা গেলে এই খাতে সরকারি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীদের ব্যয় কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রেসক্রিপশন, রোগী ভর্তি, শয্যা ও অস্ত্রোপচারের মতো সেবার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ বিনামূল্যে রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়াও মৌলিক কাঠামোর অংশ। তাই রোগ নির্ণয়সেবাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্টদের করা একটি মামলার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

পরে মামলাটি নিষ্পত্তি হলেও নিয়োগ কার্যক্রম আর স্বাভাবিক গতিতে এগোয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ থাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

এদিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল উন্নীত করার প্রক্রিয়াও দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাঁদের দাবি, ২২ বছরের বেশি সময় ধরে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এরই মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের চাকরি দশম গ্রেডে উন্নীতকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে সরকার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালে দ্রুত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া গেলে রোগ নির্ণয়সেবার পরিধি বাড়বে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর রোগীদের নির্ভরতা কমবে এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।