স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
মানুষের আয়ু সাধারণত কয়েক দশকের। কিন্তু একটি দৈত্যাকার কচ্ছপের বয়স প্রায় ১৯৪ বছর! এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার পরও তার শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়ায় বার্ধক্যের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই কচ্ছপের শরীরেই লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কাটানোর গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
কচ্ছপটির নাম জোনাথন। পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত স্থলচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত এই কচ্ছপকে নিয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট হেলথের গবেষকসহ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল।
তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জোনাথনের শরীরে কোষের শক্তি উৎপাদন এবং জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
**কোষের শক্তি উৎপাদনে লুকিয়ে আছে রহস্য**
মানুষসহ প্রায় সব প্রাণীর কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। একে কোষের শক্তি উৎপাদনকেন্দ্র বলা হয়। শরীরের নানা জৈবিক কাজ চালিয়ে নিতে এই শক্তি অপরিহার্য।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষের বিভিন্ন কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়ে মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতাতেও। কিন্তু জোনাথনের জিনগত উপাদান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, মাইটোকন্ড্রিয়ার শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী অংশে অস্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে কম।
জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ডিএনএর সঙ্গে যুক্ত মিথাইল গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো নির্দিষ্ট জিনের কার্যক্রম চালু বা বন্ধ রাখতে সাহায্য করে। গবেষকেরা এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিন্যাস বিশ্লেষণ করে জোনাথনের দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
তাদের ধারণা, জিনের এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু কোষীয় কার্যক্রম বয়সজনিত ক্ষয় থেকে আংশিক সুরক্ষা পেয়েছে। তবে এই বৈশিষ্ট্যই জোনাথনের দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
**কীভাবে শুরু হয়েছিল গবেষণা?**
প্রায় ১৮৩২ সালে ভারত মহাসাগরের সেশেলস দ্বীপপুঞ্জে জন্ম হয়েছিল জোনাথনের। ১৮৮২ সালে তাকে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানেই তার বসবাস।
২০১৭ সালে গবেষকেরা জোনাথনের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেন। তার স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে রক্তের নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে গালের ভেতরের অংশ থেকে সামান্য টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
গবেষণাটির ফলাফল ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর *Science Advances* সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
**মানুষের আয়ু বাড়ানোর পথ খুলবে কি?**
এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় বাড়ানোর গবেষণায় নতুন দিশা দেখাতে পারে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষের শক্তি উৎপাদন এবং জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে জোনাথনের শরীরে পাওয়া বৈশিষ্ট্য মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করবে, এমন প্রমাণ এখনো নেই। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফলাফল যাচাই করতে আরও উন্নত বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য জৈবিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, জোনাথনের শরীর বিজ্ঞানীদের সামনে দীর্ঘায়ুর একটি সম্ভাব্য সূত্র তুলে ধরেছে। সেই সূত্র কাজে লাগিয়ে মানুষের বার্ধক্য ধীর করা কিংবা সুস্থ জীবনের সময় বাড়ানো সম্ভব হবে কি না, তার উত্তর পেতে আরও গবেষণার অপেক্ষা করতে হবে।