স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৩ পি এম

নিকটাত্মীয়ের বাইরে অঙ্গদানের সুযোগ, দেশে ট্রান্সপ্লান্টে নতুন দিগন্ত

ছবি: প্রতীকী

ঢাকা: কিডনি কিংবা লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য উপযুক্ত নিকটাত্মীয় দাতা না পাওয়ায় বহু রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচও বহন করতে হয়।

দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে। নতুন আইনে নিকটাত্মীয়ের পাশাপাশি ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার কাছ থেকেও অঙ্গ গ্রহণের আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আইনজীবীরা বলছেন, নতুন এই বিধান দেশে কিডনি, লিভারসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে দাতা সংকটের কারণে বিদেশমুখী হওয়া রোগীদের একটি অংশকে দেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

আইন অনুযায়ী, সুস্থ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো জীবিত ব্যক্তি নিজের কোনো অঙ্গ দানের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় গুরুতর ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা না থাকলে নিকটাত্মীয়কে অঙ্গ দান করতে পারবেন।

একই শর্তে নির্ধারিত যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিঃস্বার্থবাদী দাতাও নিকটাত্মীয় নন এমন ব্যক্তিকে অঙ্গ দান করতে পারবেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নতুন আইন দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আইনে ইমোশনাল ডোনারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নিকটাত্মীয়ের বাইরে অঙ্গদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি জানান, গত ১০ আগস্ট বিএমইউতে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ডোনারের কাছ থেকে পাওয়া কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সরকারি অনুদানে বিএমইউতে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপনও সম্পন্ন হয়েছে।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, দেশে একটি লিভার প্রতিস্থাপনে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। বিদেশে গেলে এর সঙ্গে বিমানভাড়া, হোটেলসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়। দেশে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমবে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, আগে দাতার সংজ্ঞা সীমিত থাকায় নিকটাত্মীয়ের বাইরে অঙ্গদানের সুযোগ ছিল না। এ সীমাবদ্ধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ইমোশনাল ডোনারের মাধ্যমে কিডনিসহ অঙ্গদানের সুযোগ তৈরির নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন আইনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে দেশে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে এবং দাতা না পাওয়ায় বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়া রোগীর সংখ্যা কমতে পারে।

আইনে ইমোশনাল ডোনার হিসেবে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বেচ্ছায় সম্মতি দিতে সক্ষম ব্যক্তিকে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। দাতা কোনো আর্থিক প্রলোভন বা চাপের মধ্যে থাকতে পারবেন না।

গ্রহীতার নিকটাত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যক্তি নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নিঃস্বার্থবাদী দাতা হতে পারবেন। তবে সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ ও অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাণিজ্যিক ব্যবহার ঠেকাতে আইনে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। মানবদেহের কোনো অঙ্গ ক্রয়-বিক্রয়, এর বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণ এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিকটাত্মীয়তার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আইনের অন্যান্য বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

আইনে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে পারবে। ঘোষণাকারী কমিটির কোনো চিকিৎসক বা তার নিকটাত্মীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইন অঙ্গদানের সুযোগ বাড়ালেও এর সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, কঠোর যাচাই-বাছাই, দাতার স্বাধীন সম্মতি এবং বাণিজ্যিক অপব্যবহার প্রতিরোধের ওপর।

এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বহু রোগীর জন্য দেশেই চিকিৎসার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।