স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৩ পি এম

নিউরনকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ! চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী গবেষণার পেছনের গল্প

ছবি : সংগৃহীত

মস্তিষ্কের ভেতরের নির্দিষ্ট কোনো স্নায়ুকোষকে যদি ইচ্ছামতো ‘চালু’ বা ‘বন্ধ’ করা যায়, তাহলে স্মৃতি, অনুভূতি, আচরণ কিংবা বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের পেছনে আসলে কী ঘটছে, তা আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব। বিজ্ঞানের এই ধারণাকেই বাস্তব গবেষণার শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করেছেন মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ডেইসেরথ। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। একই পুরস্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল।

তাঁদের কাজের কেন্দ্রে রয়েছে আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং সেখান থেকে বিকশিত অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তি। সহজ করে বললে, বিশেষ আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট নিউরনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করাই এই প্রযুক্তির মূল ধারণা।

এই গবেষণার শুরু হয়েছিল মানুষের মস্তিষ্ক থেকে নয়, একটি ক্ষুদ্র এককোষী শৈবাল থেকে। হেগেমান ও নাগেল Chlamydomonas নামের শৈবাল নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এমন কিছু প্রোটিন শনাক্ত করেন, যেগুলো আলো অনুভব করতে পারে। এর মধ্যে channelrhodopsin নামের প্রোটিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্দিষ্ট আলো এই প্রোটিনে পড়লে আয়ন চ্যানেল খুলে যায় এবং কোষের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম বদলে যায়।

কার্ল ডেইসেরথের বড় অবদান ছিল এই ধারণাকে নিউরনের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো। তিনি ও তাঁর গবেষক দল দেখান, আলো-সংবেদনশীল প্রোটিনকে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে প্রকাশ করানো গেলে আলো ব্যবহার করে সেই নিউরনের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এভাবেই তৈরি হয় অপটোজেনেটিকস—যেখানে ‘opto’ অর্থ আলো এবং ‘genetics’ অর্থ জেনেটিক পদ্ধতি। প্রযুক্তিটি বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরন বা নিউরাল সার্কিটকে সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় করে তাদের ভূমিকা পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়।

কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? মস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরন পরস্পরের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত। আগে কোনো নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা বা ওষুধ প্রয়োগ করলে একসঙ্গে অনেক কোষ প্রভাবিত হতে পারত। ফলে ঠিক কোন নিউরন একটি নির্দিষ্ট আচরণ বা অনুভূতির জন্য দায়ী, তা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল।

অপটোজেনেটিকস সেই গবেষণায় বড় পরিবর্তন এনেছে। বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট নিউরনকে লক্ষ্য করে আলো প্রয়োগ করতে পারেন এবং দেখতে পারেন, সেই নিউরন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হলে প্রাণীর আচরণ কিংবা মস্তিষ্কের কার্যক্রমে কী পরিবর্তন ঘটে।

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মৃতি, অনুভূতি, সামাজিক আচরণসহ বিভিন্ন মস্তিষ্কীয় কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা হয়েছে। পারকিনসনস রোগ ও বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট নিউরাল সার্কিট নিয়েও গবেষণায় এটি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাণী-গবেষণায় কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সার্কিট নিয়ন্ত্রণ করে রোগের উপসর্গের পরিবর্তনও দেখা গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে আলো দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কের রোগ এখনই চিকিৎসা করা সম্ভব।

অপটোজেনেটিকসের বেশিরভাগ চিকিৎসাগত ব্যবহার এখনো গবেষণা ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

তারপরও এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বিশাল। কারণ এটি বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের ভেতরের জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নির্ভুলভাবে বোঝার একটি নতুন পথ দিয়েছে।

এক কথায়, হেগেমান ও নাগেল আলো-সংবেদনশীল ‘সুইচ’ আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, আর কার্ল ডেইসেরথ সেই ধারণাকে মস্তিষ্কের নিউরন নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী প্রযুক্তিতে রূপ দেন।

মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার এই ধারণাই খুলে দিয়েছে neuroscience গবেষণার এক নতুন দরজা।