স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৫ এএম

স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান, স্বীকৃতিতে পিছিয়ে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা

ছবি: প্রতীকী

ঢাকা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা।

হাসপাতালের প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, রেডিওথেরাপি, ফিজিওথেরাপি, ডেন্টালসহ বিভিন্ন বিভাগে তাঁদের দক্ষতা চিকিৎসাসেবার অপরিহার্য অংশ।

কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও পদমর্যাদা, পদোন্নতি, নিয়োগকাঠামো, পেশাগত স্বীকৃতি ও কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়লেও সেই অনুপাতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত হয়নি।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় তাঁদের দায়িত্ব ও দক্ষতার পরিধি বাড়লেও জনবল নিয়োগ, পদ সৃষ্টি, উচ্চতর পদে পদোন্নতি এবং পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যালায়েন্সের (বিএমটিএ) সভাপতি এস এম ওবায়দুর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্যসেবায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগকাঠামো, পদোন্নতি ও পেশাগত স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা চাই, দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি সুস্পষ্ট পদোন্নতি কাঠামো গড়ে তোলা হোক। পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ পূরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি করতে হবে।”

ফলে একদিকে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবলের সংকট মোকাবিলা কঠিন হচ্ছে, অন্যদিকে এই পেশায় কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীর নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা, এক্স-রে ও অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষা, রোগজীবাণু শনাক্তকরণ, রক্তের বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ এবং রেডিওথেরাপির মতো বিশেষায়িত সেবায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এসব পরীক্ষার ফলাফল রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসাপদ্ধতি নির্বাচন এবং রোগীর পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।

বিশেষ করে ডেঙ্গু, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগার ও প্রযুক্তিনির্ভর রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

একই সঙ্গে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা, রক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণেও দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা রয়েছে।

অথচ তাঁদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের পেশাগত সমস্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়োগকাঠামো ও পদোন্নতির সুযোগ।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় পদসংখ্যা ও জনবল পরিকল্পনা পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ে।

অন্যদিকে, পদোন্নতির জন্য উপযুক্ত পদ সৃষ্টি, পদবিন্যাস এবং অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর শিক্ষার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি হলেও এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে কোনো পেশার উন্নয়ন শুধু পদবি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অনুমোদিত পদ, নিয়োগবিধি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পদোন্নতির ধাপ, বেতনগ্রেড এবং দায়িত্বের পরিধি।

মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের মতে, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দীর্ঘদিন কাজ করার পরও যদি উচ্চতর পদে যাওয়ার সুস্পষ্ট সুযোগ না পান, তাহলে তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার ব্যাহত হতে পারে।

একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই পেশা সম্পর্কে আগ্রহ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পদোন্নতি কাঠামো, নিয়মিত নিয়োগ এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষাগার ব্যবস্থা, আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি, আণবিক রোগ নির্ণয়, উন্নত মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিস্তার মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।

এসব প্রযুক্তি কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের দক্ষতা এবং মাননিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান।

কিন্তু দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে সমানভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কোথাও যন্ত্রপাতির স্বল্পতা, কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রোগ নির্ণয় কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

এ ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা মূল্যায়ন, পেশাগত শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা-সহায়ক প্রযুক্তি, ফার্মেসি, পুনর্বাসন এবং অন্যান্য সহায়ক সেবায় দক্ষ জনবলও নিশ্চিত করতে হবে।

রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ভুল কমানো, পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের যথাযথ কর্মপরিবেশ প্রয়োজন।

এ জন্য সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ, বিভাগভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সরবরাহ, পদোন্নতির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দায়িত্ব অনুযায়ী পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্বাস্থ্য সংবাদকে বলেন, “স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা রোগ নির্ণয় ও বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের জনবল চাহিদা, বিদ্যমান পদ এবং কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।”