স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কয়েক পা হাঁটার সময় গোড়ালি বা পায়ের তলায় তীব্র ব্যথা অনুভব করেন অনেকেই। কেউ কেউ কিছুক্ষণ হাঁটার পর স্বস্তি পেলেও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা হাঁটাচলা করলে আবার ব্যথা বাড়ে। এ ধরনের ব্যথার অন্যতম কারণ হতে পারে প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস। কেন এই সমস্যা হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন এবং প্রতিকার কী, এসব বিষয়ে কথা বলেছেন অর্থোপেডিক সার্জন ডা. আসীফ দীন আহমেদ (বাঁধন)। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি।
প্রশ্ন: সকালে ঘুম থেকে উঠে পায়ের তলায় তীব্র ব্যথা হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কয়েক পা হাঁটার সময় গোড়ালি বা পায়ের তলায় তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভূত হওয়ার অন্যতম কারণ প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস। পায়ের তলার প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া নামের শক্ত টিস্যু গোড়ালির হাড় থেকে পায়ের সামনের অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি পায়ের খিলানকে সমর্থন দেয় এবং হাঁটাচলার সময় শরীরের ভার বহনে সাহায্য করে। এই টিস্যুতে অতিরিক্ত চাপ বা বারবার টান পড়লে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে রাতে বিশ্রামে থাকার পর সকালে প্রথম হাঁটার সময় ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। তবে পায়ের তলায় ব্যথার অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা যায় না।
প্রশ্ন: প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস কেন হয়?
উত্তর: এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, অনেকক্ষণ হাঁটা, অতিরিক্ত দৌড়ানো বা ব্যায়াম, শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া এবং শক্ত বা অনুপযুক্ত জুতা ব্যবহার করার কারণে পায়ের তলার টিস্যুতে চাপ বাড়তে পারে। যাঁদের কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাঁরাও ঝুঁকিতে থাকেন। আবার হঠাৎ হাঁটা বা ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কারণের পরিবর্তে একাধিক বিষয় মিলেও ব্যথা তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন: এই সমস্যার প্রধান লক্ষণগুলো কী?
উত্তর: সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কয়েক পা হাঁটার সময় গোড়ালি বা পায়ের তলায় তীব্র ব্যথা হওয়া। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর উঠে হাঁটলেও একই ধরনের ব্যথা দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ব্যথা কমে আসে, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা বেশি হাঁটাচলার পর আবার বাড়ে। সাধারণত গোড়ালির নিচের দিকে বা পায়ের তলার ভেতরের অংশে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। তবে ব্যথার স্থান ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
প্রশ্ন: পায়ের তলায় ব্যথা হলেই কি প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে?
উত্তর: না। পায়ের তলায় ব্যথার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস ছাড়াও স্নায়ুর সমস্যা, গোড়ালির হাড়ে আঘাত, টেন্ডনের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো প্রদাহজনিত কারণে ব্যথা হতে পারে। ব্যথার ধরন, কত দিন ধরে হচ্ছে, কোথায় বেশি হচ্ছে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক সম্ভাব্য কারণ নির্ণয় করেন। প্রয়োজন হলে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: এ ধরনের ব্যথা কমাতে ঘরে কী করা যেতে পারে?
উত্তর: প্রথমত, যেসব কাজ করলে ব্যথা বাড়ে, সেগুলোর চাপ সাময়িকভাবে কমাতে হবে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, অতিরিক্ত হাঁটা বা দৌড়ানো থেকে বিরতি নেওয়া যেতে পারে। পায়ের খিলানকে যথাযথ সমর্থন দেয় এমন আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা জরুরি। শক্ত মেঝেতে খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা ভালো। কাপড়ে মোড়ানো বরফের প্যাক ব্যথার স্থানে ১৫ থেকে ২০ মিনিট প্রয়োগ করলে আরাম পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের পেশি ও প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। তবে ব্যথা বাড়লে ব্যায়াম বন্ধ করে পরামর্শ নিতে হবে।
প্রশ্ন: জুতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন?
উত্তর: এমন জুতা নির্বাচন করা উচিত, যা পায়ের খিলানকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয় এবং গোড়ালিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না। জুতার তলা আরামদায়ক হওয়া, গোড়ালিতে যথেষ্ট কুশনিং থাকা এবং জুতা পায়ের মাপে উপযুক্ত হওয়া জরুরি। অতিরিক্ত শক্ত, একেবারে সমতল বা ক্ষয়ে যাওয়া জুতা কিছু মানুষের ব্যথা বাড়াতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বিশেষ ধরনের জুতার ইনসার্ট বা অর্থোটিক ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রশ্ন: শরীরের ওজনের সঙ্গে এই ব্যথার কোনো সম্পর্ক আছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ। শরীরের অতিরিক্ত ওজন পায়ের তলার টিস্যুতে চাপ বাড়াতে পারে। এ কারণে অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত জুতা ব্যবহার এবং নিয়মিত স্ট্রেচিংয়ের মাধ্যমে পায়ের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা উচিত।
প্রশ্ন: ব্যথা হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
উত্তর: ব্যথা বারবার হলে, কয়েক সপ্তাহেও না কমলে কিংবা দৈনন্দিন চলাফেরায় সমস্যা তৈরি করলে অর্থোপেডিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আঘাতের পর তীব্র ব্যথা, পায়ে ভর দিতে না পারা, উল্লেখযোগ্য ফোলা বা লালচে হয়ে যাওয়া, জ্বর কিংবা পায়ে অবশভাব থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের ব্যথা বা ক্ষতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি করা ঠিক নয়।
প্রশ্ন: প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক পরিচর্যা ও উপযুক্ত চিকিৎসায় ধীরে ধীরে উন্নতি হয়। তবে সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ব্যথার কারণ ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। প্রয়োজন হলে ফিজিওথেরাপি, বিশেষ জুতার ইনসার্ট কিংবা অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে। দীর্ঘদিনের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হয়। নিজে থেকে ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করা উচিত নয়।
প্রশ্ন: পায়ের তলার ব্যথা প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে কী পরামর্শ দেবেন?
উত্তর: পায়ের ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিতে হবে। হাঁটা বা ব্যায়ামের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে, হঠাৎ অতিরিক্ত পরিশ্রম করা যাবে না এবং পায়ের উপযোগী জুতা ব্যবহার করতে হবে। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ও নিয়মিত স্ট্রেচিংও উপকারী। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কয়েক পা হাঁটার সময় গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা হলে সেটিকে শুধু ক্লান্তি ভেবে দীর্ঘদিন অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।