স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ পি এম

ব্রণ শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য ত্বকের রোগ

ফাইল ছবি

স্বাস্থ্য সংবাদ: ব্রণ বা অ্যাকনে কী? এটি কি শুধু কিশোর-কিশোরীদের রোগ?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: ব্রণ বা অ্যাকনে (Acne) হলো ত্বকের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত (Chronic Inflammatory) রোগ। এটি তখনই হয়, যখন ত্বকের রোমকূপ (Hair Follicle) ও তেলগ্রন্থি (Sebaceous Gland) কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে প্রদাহ তৈরি হয়। অনেকেই মনে করেন ব্রণ শুধু কিশোর-কিশোরীদের সমস্যা। বাস্তবে তা নয়। যদিও বয়ঃসন্ধিকালে ব্রণ বেশি দেখা যায়, তবে ২০, ৩০ এমনকি ৪০ বছর বয়সেও অনেক নারী-পুরুষ ব্রণের সমস্যায় ভুগে থাকেন।

স্বাস্থ্য সংবাদ: ব্রণ হওয়ার মূল কারণ কী?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: আসলে ব্রণ কোনো একটি কারণে হয় না। এটি একটি বহুমাত্রিক রোগ। সাধারণত পাঁচটি প্রধান কারণ একসঙ্গে কাজ করে।

প্রথম কারণ হলো অতিরিক্ত তেল (Sebum) উৎপাদন। আমাদের ত্বকের নিচে থাকা তেলগ্রন্থি ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে স্বাভাবিকভাবেই তেল তৈরি করে। কিন্তু হরমোনের প্রভাবে এই তেল অতিরিক্ত তৈরি হলে রোমকূপ বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্রণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

দ্বিতীয় কারণ হলো রোমকূপ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ত্বকের মৃত কোষ নিয়মিত ঝরে পড়ার কথা। কিন্তু এগুলো যখন অতিরিক্ত তেলের সঙ্গে মিশে রোমকূপ আটকে দেয়, তখন ব্ল্যাকহেড, হোয়াইটহেড এবং পরে ব্রণ তৈরি হয়।

তৃতীয় কারণ হলো Cutibacterium acnes নামের ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া আমাদের ত্বকে স্বাভাবিকভাবেই থাকে। কিন্তু রোমকূপ বন্ধ হয়ে গেলে এটি দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে। তখন লাল, ব্যথাযুক্ত ও পুঁজযুক্ত ব্রণ দেখা দেয়।

চতুর্থ কারণ হলো হরমোনের পরিবর্তন। বয়ঃসন্ধি, মাসিকের আগে, গর্ভাবস্থা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) কিংবা হরমোনজনিত অন্য সমস্যার কারণে তেল উৎপাদন বেড়ে যায় এবং ব্রণ বৃদ্ধি পায়।

পঞ্চম কারণ হলো বংশগত প্রবণতা। পরিবারের সদস্যদের কারও ব্রণের ইতিহাস থাকলে অন্য সদস্যদেরও ব্রণ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।

স্বাস্থ্য সংবাদ: অনেকেই বলেন, চকলেট বা তৈলাক্ত খাবার খেলেই ব্রণ হয়। এটি কতটা সত্য?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: এটি পুরোপুরি সত্য নয়। শুধু চকলেট খেলেই ব্রণ হয়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড এবং উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্রণ বাড়াতে পারে। আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দুগ্ধজাত খাবারও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়।

স্বাস্থ্য সংবাদ: স্ট্রেস বা অনিয়মিত জীবনযাপনের সঙ্গে কি ব্রণের সম্পর্ক রয়েছে?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: অবশ্যই। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে, যা ব্রণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শুধু ওষুধ খেলেই হবে না, জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

স্বাস্থ্য সংবাদ: প্রসাধনী ব্যবহারেও কি ব্রণ হতে পারে?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: হ্যাঁ। ত্বকের ধরন অনুযায়ী প্রসাধনী নির্বাচন না করলে বা তেলযুক্ত (Oil-based) প্রসাধনী ব্যবহার করলে অনেক সময় রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ দেখা দেয়। তাই সবসময় Non-comedogenic এবং Oil-free প্রসাধনী ব্যবহার করার পরামর্শ দিই।

স্বাস্থ্য সংবাদ: ব্রণ হলে অনেকেই নিজে থেকেই বিভিন্ন ক্রিম ব্যবহার করেন। এটি কি নিরাপদ?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: মোটেও না। বাজারে সহজলভ্য অনেক ক্রিমে স্টেরয়েড থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ক্রিম ব্যবহার করলে প্রথমে ব্রণ কমেছে বলে মনে হলেও পরে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। পাশাপাশি ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া, লালচে ভাব, দাগ ও সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।

স্বাস্থ্য সংবাদ: ব্রণ হলে কী ধরনের যত্ন নেওয়া উচিত?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: প্রথমত, দিনে দুইবার মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে হবে। ব্রণ খোঁচানো বা ফাটানো যাবে না, কারণ এতে স্থায়ী দাগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রণ দীর্ঘদিন থাকলে বা ব্যথাযুক্ত ও পুঁজযুক্ত হলে অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য সংবাদ: ব্রণ কি পুরোপুরি ভালো হয়?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: অবশ্যই। ব্রণ একটি সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য রোগ। তবে রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসার সময় ভিন্ন হতে পারে। কারও কয়েক মাস, আবার কারও ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে। তাই ধৈর্য ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। অনেকেই কয়েক সপ্তাহ ওষুধ ব্যবহার করে বন্ধ করে দেন, এতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

স্বাস্থ্য সংবাদ: ব্রণ নিয়ে আপনার পরামর্শ কী?

ডা. পার্থ প্রতীম বিশ্বাস: ব্রণকে অবহেলা করবেন না, আবার অযথা ভয়ও পাবেন না। এটি খুবই সাধারণ এবং চিকিৎসাযোগ্য একটি রোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পরিচিতজনের পরামর্শে ওষুধ বা ক্রিম ব্যবহার না করে, সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে ব্রণ যেমন নিয়ন্ত্রণে আসে, তেমনি স্থায়ী দাগ হওয়ার ঝুঁকিও অনেকটাই কমে যায়।