স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৬ জুলাই ২০২৬, ১২:২২ এএম

পিত্তথলির পাথর: কখন অপারেশন জরুরি, জানালেন ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ

ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্নকর্তা: স্বাস্থ্য সংবাদ
অতিথি: ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ
সহকারী অধ্যাপক (ভাসকুলার সার্জারি), জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
স্বাস্থ্য সংবাদ: পিত্তথলির পাথর কী? এটি কেন হয়?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: পিত্তথলি বা গলব্লাডার হলো লিভারের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলি, যেখানে পিত্তরস জমা থাকে। এই পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন বা অন্যান্য উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হলে ধীরে ধীরে পাথর তৈরি হতে পারে। বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, পারিবারিক ইতিহাস, বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া এবং দ্রুত ওজন কমে যাওয়া—এসব কারণে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
স্বাস্থ্য সংবাদ: কী ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে একজন রোগীর সতর্ক হওয়া উচিত?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা, যা অনেক সময় পিঠ বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বমি বমি ভাব, বমি, তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি, হজমে সমস্যা এবং গ্যাসের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। যদি জ্বর, তীব্র ব্যথা বা চোখ-মুখ হলুদ হয়ে যায়, তাহলে এটি জটিলতার লক্ষণ হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
স্বাস্থ্য সংবাদ: অনেকেই বলেন, পাথর থাকলেও কোনো সমস্যা না হলে অপারেশন দরকার নেই। বিষয়টি কী?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: সব ক্ষেত্রে অপারেশন প্রয়োজন হয় না। যদি পাথর ধরা পড়ে কিন্তু কোনো উপসর্গ না থাকে, তাহলে অনেক সময় নিয়মিত পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। তবে ব্যথা বারবার হলে, প্রদাহ, সংক্রমণ বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে অপারেশনই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
স্বাস্থ্য সংবাদ: বর্তমানে পিত্তথলির পাথরের সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা কী?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: বর্তমানে ল্যাপারোস্কপিক কোলেসিস্টেকটমি বা ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতে পিত্তথলি অপসারণই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত। এই পদ্ধতিতে পেটে বড় কাটা লাগে না; কয়েকটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে অপারেশন করা হয়।
স্বাস্থ্য সংবাদ: ল্যাপারোস্কপিক অপারেশনের প্রধান সুবিধাগুলো কী?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: এর অনেক সুবিধা রয়েছে। যেমন—
পেটে বড় কাটা লাগে না।
অপারেশনের পর ব্যথা তুলনামূলক কম হয়।
রক্তক্ষরণ কম হয়।
সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে।
হাসপাতালে কম সময় থাকতে হয়।
রোগী দ্রুত হাঁটাচলা ও স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারেন।
শরীরে দাগও খুব সামান্য থাকে।
এ কারণে বর্তমানে অধিকাংশ রোগীর জন্য এটিই প্রথম পছন্দের চিকিৎসা।
স্বাস্থ্য সংবাদ: অপারেশনের পর রোগী কত দিনের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: সাধারণত অপারেশনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রোগী বাসায় যেতে পারেন, যদি অন্য কোনো জটিলতা না থাকে। অধিকাংশ মানুষ এক সপ্তাহের মধ্যে হালকা কাজ এবং দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে যেতে পারেন।
স্বাস্থ্য সংবাদ: পিত্তথলি অপসারণের পর কি স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: অবশ্যই সম্ভব। পিত্তথলি মূলত পিত্তরস সংরক্ষণ করে। এটি অপসারণের পরও লিভার স্বাভাবিকভাবে পিত্তরস তৈরি করে এবং বেশিরভাগ মানুষ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভোগেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছুদিন খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা অবলম্বন করলেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়।
স্বাস্থ্য সংবাদ: পিত্তথলির পাথর কি ওষুধে গলানো সম্ভব?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: খুব সীমিত কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হলেও সেটি সব রোগীর জন্য কার্যকর নয়। এতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে আবার পাথর ফিরে আসে। তাই উপসর্গযুক্ত অধিকাংশ রোগীর জন্য ল্যাপারোস্কপিক অপারেশনই সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান।
স্বাস্থ্য সংবাদ: এই রোগ প্রতিরোধে কী ধরনের জীবনযাপন অনুসরণ করা উচিত?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা খুব দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করাই ভালো।
স্বাস্থ্য সংবাদ: শেষ প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: পেটের ডান পাশে বারবার ব্যথা, তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি বা বমি বমি ভাবকে অবহেলা করবেন না। অনেকেই ব্যথানাশক খেয়ে সময় নষ্ট করেন, এতে জটিলতা বাড়তে পারে। সময়মতো আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন হলে আধুনিক ল্যাপারোস্কপিক অপারেশনের মাধ্যমে নিরাপদে চিকিৎসা নিয়ে দ্রুত সুস্থ জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।
স্বাস্থ্য সংবাদ: মূল্যবান সময় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
ডা. শান্তনু কুমার ঘোষ: আপনাকেও ধন্যবাদ। সচেতনতা বাড়লেই অনেক রোগের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।