স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
প্রশ্নকর্তা: চল্লিশ বছর বয়সের পর নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: একজন মা শুধু পরিবারের একজন সদস্য নন, তিনি পুরো পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু আমাদের সমাজে অধিকাংশ মা সংসার ও সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে যান। বিশেষ করে চল্লিশ বছর পার হওয়ার পর নারীদের শরীরে বিভিন্ন হরমোনজনিত ও শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়। এই সময় থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাড় ক্ষয়, থাইরয়েড সমস্যা এবং মানসিক চাপের মতো নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই এই বয়সে স্বাস্থ্যসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নকর্তা: চল্লিশের পর একজন মায়ের শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: এই বয়সে অনেক নারীর ক্ষেত্রে মেনোপজের পূর্বলক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ওজন বৃদ্ধি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক অস্থিরতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অনেকেই এসবকে বয়সজনিত স্বাভাবিক সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রশ্নকর্তা: চল্লিশোর্ধ্ব মায়েদের জন্য কোন স্বাস্থ্য পরীক্ষাগুলো নিয়মিত করা জরুরি?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: প্রথমেই বলবো রক্তচাপ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ এটি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই হৃদরোগ, স্ট্রোক বা কিডনি রোগের কারণ হতে পারে। এছাড়া বছরে অন্তত একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা, বিশেষ করে ফাস্টিং ব্লাড সুগার ও এইচবিএ১সি করা উচিত।
কোলেস্টেরল পরীক্ষা বা লিপিড প্রোফাইলও বছরে একবার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্তন ক্যানসার ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি। ৪০ বছরের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেমোগ্রাফি করা উচিত এবং নিয়মিত ভিআইএ টেস্টের মাধ্যমে জরায়ুমুখ ক্যানসারের পরীক্ষা করানো উচিত।
প্রশ্নকর্তা: হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে আপনার পরামর্শ কী?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রয়োজন হলে বোন ডেনসিটি পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত রোদে হাঁটা, দুধ, ডিম, ছোট মাছ ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রশ্নকর্তা: চোখ ও দাঁতের পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা কতটা?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়া, ছানি, ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা এবং দাঁতের বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। তাই বছরে অন্তত একবার চোখ ও দাঁত পরীক্ষা করা উচিত।
প্রশ্নকর্তা: স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে চল্লিশোর্ধ্ব মায়েদের কী কী বিষয় মেনে চলা উচিত?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: প্রথমত, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, প্রোটিন ও পর্যাপ্ত পানি রাখতে হবে। অতিরিক্ত তেল, চর্বি, লবণ ও চিনি পরিহার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা প্রয়োজন। এটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘসময় একটানা বসে থাকা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
প্রশ্নকর্তা: মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: অনেক মা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন না। সন্তান বড় হয়ে গেলে অনেক সময় একাকীত্বও তৈরি হয়। তাই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, নিজের পছন্দের কাজ করা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নকর্তা: দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: হাড় দুর্বল হলে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাথরুম শুকনো রাখা, পিছল স্যান্ডেল ব্যবহার না করা এবং সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা উচিত নয়। অনেক মা পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর পর নিজের খাবার খান, যা গ্যাস্ট্রিক, দুর্বলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশ্নকর্তা: কোন উপসর্গগুলোকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক রক্তপাত, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো শারীরিক সমস্যা কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রশ্নকর্তা: পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়, সন্তান ও পরিবারেরও দায়িত্ব রয়েছে। অনেক মা পরিবারের কথা ভেবে নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেন। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা, ওষুধ সঠিকভাবে খাওয়া হচ্ছে কি না খোঁজ রাখা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও হাঁটার সুযোগ করে দেওয়া।
প্রশ্নকর্তা: একজন চিকিৎসক হিসেবে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কী?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন:হাসপাতালে প্রায়ই দেখি, অসুস্থ হয়ে পড়ার পর অনেক মা আফসোস করে বলেন—‘সবার খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের কথা ভাবিনি।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একজন মায়ের আজীবনের ত্যাগ। আমরা চাই, মায়েরা শুধু পরিবারের জন্য নয়, নিজেদের জন্যও বাঁচুন। কারণ মা সুস্থ থাকলে পরিবার সুস্থ থাকে, সমাজ সুস্থ থাকে।
ডা. মো. সাঈদ হোসেন
কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, মুন্সীগঞ্জ