স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

ডেস্ক প্রতিবেদক
  ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম

'ফ্যাটি লিভার এখন নীরব মহামারী'-ডা. আনহারুর রহমান

ফাইল ছবি

বর্তমান সময়ে স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে দেশে ফ্যাটি লিভারের রোগী দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই এটিকে সাধারণ সমস্যা মনে করলেও চিকিৎসকদের মতে, অবহেলা করলে এটি লিভার ফাইব্রোসিস, এমনকি সিরোসিসেও রূপ নিতে পারে। ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি, লক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রতিরোধ নিয়ে স্বাস্থ্য সংবাদ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন ডা. আনহারুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক (সার্জারি) ও কনসালটেন্ট, ল্যাপারোস্কপিক, পরিপাকতন্ত্র, হেপাটোবিলিয়ারি ও প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি।


প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভার বা MASLD কী?

ডা. আনহারুর রহমান:
আগে যাকে আমরা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) বলতাম, বর্তমানে সেটির নাম হয়েছে MASLD (Metabolic Dysfunction Associated Steatotic Liver Disease)। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের বিপাকীয় সমস্যার কারণে লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকে। অতিরিক্ত ক্যালরি, চিনি, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এর প্রধান কারণ।

প্রশ্ন: অনেকেই মনে করেন বয়স বাড়লে ভুঁড়ি হওয়া স্বাভাবিক। এই ধারণা কতটা সঠিক?

ডা. আনহারুর রহমান:
এটি একটি ভুল ধারণা। বয়সের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন আসতেই পারে, কিন্তু অতিরিক্ত ভুঁড়ি বা পেটে চর্বি জমা স্বাভাবিক নয়। বরং এটি শরীরের ভেতরে মেটাবলিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। যাদের পেটে অতিরিক্ত মেদ রয়েছে, তাদের ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বেশি থাকে।

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক লক্ষণ কী কী?

ডা. আনহারুর রহমান:
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি অনেক সময় কোনো লক্ষণই প্রকাশ করে না। তবে কিছু সতর্ক সংকেত থাকতে পারে। যেমন—

  • ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও সকালে সতেজ না লাগা।
  • সারাদিন ক্লান্তি বা ঝিমুনি অনুভব করা।
  • পাঁজরের ডান পাশে ভারী ভাব বা হালকা অস্বস্তি।
  • পেটের ভুঁড়ি আগের তুলনায় শক্ত বা টানটান মনে হওয়া।

এসব লক্ষণকে অনেকেই গ্যাস্ট্রিক বা কাজের চাপ ভেবে এড়িয়ে যান, যা ঠিক নয়।

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে কীভাবে?

ডা. আনহারুর রহমান:
খুব সহজ দুটি পরীক্ষাতেই প্রাথমিকভাবে এটি শনাক্ত করা সম্ভব।

১. USG of Whole Abdomen
২. Liver Function Test (LFT/SGPT)

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারে চর্বি জমেছে কি না এবং লিভারের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: রিপোর্টে যদি Grade 1 বা Grade 2 ফ্যাটি লিভার আসে, তাহলে কি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে?

ডা. আনহারুর রহমান:
না, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। Grade 1 বা Grade 2 পর্যায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রিভার্স করাও সম্ভব। তবে অবহেলা করলে এটি ধীরে ধীরে লিভার ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং গুরুতর জটিলতায় পরিণত হতে পারে।

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভারের জন্য কি কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ আছে?

ডা. আনহারুর রহমান:
এ মুহূর্তে এমন কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই, যা শুধু খেলে লিভারের চর্বি গলে যাবে। চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন। রোগীর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে সেগুলোরও যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন করলে উপকার পাওয়া যায়?

ডা. আনহারুর রহমান:
প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত বর্তমান ওজনের অন্তত ৭–১০ শতাংশ কমানো। গবেষণায় দেখা গেছে, এতটুকু ওজন কমলেও লিভারের প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এ ছাড়া—

  • কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও অতিরিক্ত মিষ্টি এড়িয়ে চলতে হবে।
  • রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত ২–৩ ঘণ্টা আগে শেষ করতে হবে।
  • প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে হবে।

প্রশ্ন: পাঠকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ডা. আনহারুর রহমান:
ফ্যাটি লিভারকে কখনোই হালকাভাবে নেবেন না। এটি একটি নীরব রোগ, যা দীর্ঘদিন কোনো বড় উপসর্গ ছাড়াই শরীরের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের ওজন বেশি, ডায়াবেটিস আছে, কোমরের মাপ বেড়েছে বা দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করছেন, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। সময়মতো শনাক্ত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

স্বাস্থ্য সংবাদ: ধন্যবাদ আপনাকে।

ডা. আনহারুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। আশা করি মানুষ সচেতন হলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।