স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫২ পি এম

পারকিনসনের উপসর্গ কমাতে নতুন আল্ট্রাসাউন্ড চিকিৎসা

ছবি : সংগৃহীত

হাত কাঁপা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলায় অসুবিধা—পারকিনসন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে এসব সমস্যা। ওষুধে উপসর্গ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলে অনেক রোগীর জন্য বিকল্প চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এমন পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার ছাড়াই নির্দিষ্ট অংশে শব্দতরঙ্গ প্রয়োগের মাধ্যমে উপসর্গ কমানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড চিকিৎসা।

পারকিনসন রোগ কী?

পারকিনসন হলো মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রমশ বাড়তে থাকা রোগ। মস্তিষ্কের যে স্নায়ুকোষগুলো ডোপামিন নামের রাসায়নিক তৈরি করে, সেগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। ডোপামিন মস্তিষ্ককে শরীরের চলাফেরা ও পেশির নড়াচড়া সমন্বয় করতে সাহায্য করে।

এ রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হাত-পা কাঁপা, চলাফেরা ধীর হয়ে যাওয়া, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং হাঁটার সময় ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা। কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিষণ্নতা কিংবা ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

কেন হয় পারকিনসন রোগ?

পারকিনসন রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বয়স বৃদ্ধি, বংশগত কিছু বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত কিছু উপাদান এ রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়লেও কম বয়সেও এ রোগ হতে পারে। এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়।

কীভাবে হয় চিকিৎসা?

পারকিনসন রোগের বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাময়ের চিকিৎসা নেই। তবে ওষুধের মাধ্যমে ডোপামিনের ঘাটতি পূরণ বা এর কার্যকারিতা বাড়িয়ে অনেক উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি, নিয়মিত শরীরচর্চা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা রোগীর চলাফেরা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গভীর মস্তিষ্কীয় উদ্দীপনা বা ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (ডিবিএস) পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।

নতুন আল্ট্রাসাউন্ড চিকিৎসা কীভাবে কাজ করে?

 যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েইল কর্নেল মেডিসিনের গবেষকদের পরিচালিত একাধিক কেন্দ্রের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এমআরআই-নির্দেশিত ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে পারকিনসনের কিছু নড়াচড়াজনিত জটিলতা কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।

এ পদ্ধতিতে মাথায় কোনো কাটাছেঁড়া না করেই বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চমাত্রার শব্দতরঙ্গ মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে কেন্দ্রীভূত করা হয়।

এমআরআইয়ের সাহায্যে চিকিৎসক লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করেন। সেখানে নিয়ন্ত্রিত তাপ প্রয়োগ করে স্নায়ুপথের একটি ক্ষুদ্র অংশে পরিবর্তন আনা হয়, যাতে অস্বাভাবিক স্নায়ুসংকেত কমে এবং নড়াচড়ার কিছু সমস্যা প্রশমিত হয়।

গবেষণায় ৫৪ জন পারকিনসন রোগী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন মস্তিষ্কের দুই পাশেই পর্যায়ক্রমে চিকিৎসা নেন। দ্বিতীয় চিকিৎসার তিন মাস পর ৮৬ শতাংশ রোগী নড়াচড়ার উপসর্গে অন্তত কিছুটা উন্নতির কথা জানান এবং ৬২ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, মস্তিষ্কের দ্বিতীয় পাশে চিকিৎসা দেওয়ার পর কথা বলা, হাঁটা ও ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই রোগী নির্বাচন ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিতে হয়।

সবার জন্য কি এই চিকিৎসা উপযোগী?

ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড পারকিনসন রোগ সারিয়ে দেয় না। এটি নির্দিষ্ট কিছু নড়াচড়াজনিত উপসর্গ কমানোর একটি চিকিৎসা বিকল্প। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা, আগের চিকিৎসার ফল এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন এ পদ্ধতি উপযুক্ত কি না। ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।