স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পি এম

চিঠির পর চিঠি, তবু ১০ম গ্রেডে উন্নীত হচ্ছে না মেডিকেল টেকনোলজিস্ট-ফার্মাসিস্টরা

ছবি: প্রতীকী

ঢাকা: মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে দেড় বছরেরও বেশি আগে।

এরপর একের পর এক চিঠি, কমিটি, প্রস্তাব, তথ্য চাওয়া, নথি যাচাই এবং আর্থিক সংশ্লেষ নিরূপণের প্রক্রিয়া এগোলেও এখনো চূড়ান্তভাবে গ্রেড উন্নীত হয়নি।

ফলে দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা।

সরকারি নথিপত্রের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিষয়টি একেবারে থেমে নেই। বরং গত প্রায় দেড় বছরে প্রশাসনিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করেছে।

কিন্তু প্রতিটি ধাপের পর নতুন করে তথ্য চাওয়া বা প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লাগছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ২০২৫ সালের ২০ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়। এতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পদ ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে পাওয়া স্মারকলিপির কথা উল্লেখ করা হয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়, বিষয়টি পর্যালোচনা ও মতামত দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট পদ ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে মতামত দেবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

তখন বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। ওই সময় বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পদকে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল উন্নীত করার দাবি নিয়ে আলোচনা চলছে।

মে মাসের চিঠির পর ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আবার চিঠি পাঠানো হয়। এতে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়।

এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের নির্ধারিত চেকলিস্ট পূরণসহ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পদ সৃষ্টির সরকারি আদেশ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি, অর্থ বিভাগের সম্মতি, বেতন স্কেল ভেটিং এবং প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় নথি চাওয়া হয়।

অর্থাৎ, প্রস্তাবটি তখন নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আর্থিক যাচাইয়ের পর্যায়ে আছে। 

এরপর ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবার চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি পাঠানোর কথা জানানো হয়।

কিন্তু এরপরও বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। নভেম্বরের শেষ দিকে ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টরা কর্মবিরতি পালন করেন। দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা শাখা-৬ থেকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি দেওয়া হয়। এতে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণের আর্থিক সংশ্লেষ সম্পর্কে মতামত দেওয়ার সুবিধার্থে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।

অর্থ বিভাগের চিঠিতে ৭ ক্যাটাগরির ৫ হাজার ২১১টি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং ১ হাজার ১০টি ফার্মাসিস্ট পদসহ মোট ৬ হাজার ৪৩টি পদের যোগদানের তারিখ এবং বর্তমানে কর্মরতদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া করোনাকালে সৃষ্ট ৩ হাজার পদ সম্পর্কেও তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ১ হাজার ২০০, মেডিকেল টেকনিশিয়ান ১ হাজার ৬৫০ এবং কার্ডিওগ্রাফার ১৫০টি পদ রয়েছে।

এসব পদ কত বছর সংরক্ষণ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদগুলোর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে কি না, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজস্বখাতে সংশ্লিষ্ট পদে কত শূন্য পদ রয়েছে এবং ২০২০ সালের ২০ মার্চ থেকে পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট পদের সঙ্গে এসব পদের কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে, এসব তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে যেসব পদের নিয়োগ বিধি নেই, সেসব পদের নিয়োগ বিধি প্রণয়নের অগ্রগতির তথ্য এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের টিওঅ্যান্ডইতে করোনাকালে সৃষ্ট ৩ হাজার পদ কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার হালনাগাদ কপিও চেয়েছে অর্থ বিভাগ।

এতে বোঝা যায়, গ্রেড উন্নীতকরণের বিষয়টি শুধু পদমর্যাদা পরিবর্তনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়, পদসংখ্যা, নিয়োগবিধি এবং সাংগঠনিক কাঠামোর বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও বিষয়টি নিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, ডেন্টাল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের অনুমোদিত, পূরণকৃত ও শূন্য পদের হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও তার বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যালায়েন্স (বিএমটিএ) ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বরের কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সমর্থনের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।

বিএমটিএর সভাপতি এস এম ওবায়দুর রহমান বলেন, “আমরা দেখছি, ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে সরকারি পর্যায়ে একাধিক চিঠি হয়েছে, তথ্য চাওয়া হয়েছে, প্রস্তাব গেছে। এরপরও যদি নতুন করে তথ্য সংগ্রহ চলতেই থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হবে। আমরা চাই, প্রয়োজনীয় তথ্য একবারেই সংগ্রহ করে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।”

তিনি আরও বলেন, “মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগ নির্ণয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব রয়েছে। তাই পদমর্যাদা ও দায়িত্বের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। আমরা কোনো ধরনের অযৌক্তিক সুবিধা চাই না; দায়িত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যৌক্তিক পদমর্যাদা চাই।”

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ, “বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে একটি পদ ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দাবি বিবেচনা করলেই হয় না। অনুমোদিত পদসংখ্যা, কর্মরত জনবল, শূন্য পদ, আর্থিক সংশ্লেষ, নিয়োগবিধি এবং সাংগঠনিক কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে হয়।”