স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন এখানে আসে অসংখ্য মানুষ, কেউ অসুস্থ শরীর নিয়ে, কেউ স্বজনের হাত ধরে, কেউবা বুকভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে। কারও চোখে থাকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন, আবার কারও চোখে প্রিয়জনকে হারানোর ভয়।
এই ব্যস্ত হাসপাতাল চত্বরে প্রতিদিন নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন অনেক চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের কেউ আলোচনায় আসেন, কেউ থেকে যান নেপথ্যে। কিন্তু তাঁদের কাজের গল্পগুলো কখনো কখনো এমনভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়, যা আলাদা করে বলার দাবি রাখে।
তেমনই একজন ভোলা সদরের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরাফাতুর রহমান।
হাসপাতালের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ সদস্যের চোখে দীর্ঘদিন ধরে দেখা এই চিকিৎসকের কর্মব্যস্ততা ও মানবিক আচরণই হয়ে উঠেছে এই গল্পের মূল কথা।
হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিনই চিকিৎসক, রোগী, স্বজন ও হাসপাতালকর্মীদের কাছাকাছি থাকতে হয়। সেই সুবাদে ডা. আরাফাতুর রহমানকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
আর সেই দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট, নির্দিষ্ট দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়েও রোগীর পাশে থাকার এক ধরনের দায়বদ্ধতা যেন তাঁর প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
সকাল শুরু হয় সময়মতো হাসপাতালে এসে।
এরপর রাউন্ড। এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীদের দেখেন। শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য নয়, বরং প্রতিটি রোগীর বিষয়ে যত্ন নিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন। কার কী সমস্যা, কার চিকিৎসায় কী পরিবর্তন এসেছে, এসব দেখেশুনে শেষ হয় সকালের রাউন্ড।
রাউন্ড শেষ হলেও তাঁর কর্মঘণ্টা যেন শেষ হয় না।
শুরু হয় আউটডোরের রোগী দেখা। একের পর এক রোগী আসে। কারও শারীরিক সমস্যা, কারও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, আবার কেউ আসে হঠাৎ কোনো জটিলতা নিয়ে। রোগীর সংখ্যা যতই হোক, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার এই ব্যস্ততা চলতে থাকে।
কখনো কখনো আউটডোরের রোগী দেখা শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা ছুঁইছুঁই।
তারপর লাঞ্চ।
সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবারও সন্ধ্যায় হাসপাতালে ফেরা।
যখন অধিকাংশ মানুষ দিনের কাজ শেষ করে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নেয়, তখনও তাঁর কর্মব্যস্ততা চলতে থাকে। হাসপাতালের প্রশাসনিক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নানা কাজ শেষ করতে করতে রাত ১০টা, ১১টা, কখনো কখনো ১২টাও বেজে যায়।
একজন চিকিৎসকের কাছে দায়িত্ব পালন হয়তো চাকরির অংশ। কিন্তু দায়িত্বের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি রোগীর কথা মাথায় থাকে, হাসপাতালের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যদি ছুটে চলতে হয়, তখন সেই দায়িত্ববোধকে শুধু চাকরির সংজ্ঞায় আটকে রাখা কঠিন।
ডা. আরাফাতুর রহমানের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো তাঁর আচরণ।
এত ব্যস্ততার মধ্যেও রোগী, রোগীর স্বজন কিংবা হাসপাতালের কোনো স্টাফের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করতে তাঁকে দেখা যায়নি, এমনটাই বলছেন দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল এলাকায় দায়িত্ব পালন করা এক পুলিশ সদস্য।
একজন মানুষকে চেনার সবচেয়ে বড় উপায় হয়তো তাঁর পদ নয়, তাঁর ব্যবহার।
চিকিৎসক মানেই কেবল প্রেসক্রিপশন লেখা কিংবা রোগ নির্ণয় করা নয়। অসুস্থ একজন মানুষের ভয়কে একটু কমিয়ে দেওয়া, স্বজনের উৎকণ্ঠার সময়ে আশ্বস্ত করা, বিপদের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো, এসবও চিকিৎসাসেবারই অংশ।
আমাদের সমাজে বিতর্ক আছে। প্রতিটি পেশায় আছে ভালো-মন্দের মিশ্রণ। কোনো কোনো মানুষের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কখনো পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, কখনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে, কখনো প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে নিয়ে সমালোচনা হয়।
কিন্তু একজনের ভুল দিয়ে একটি পুরো পেশাকে বিচার করা কি ন্যায়সংগত?
একজন খারাপ মানুষের কারণে পুরো একটি পেশার মানুষকে খারাপ বলা যেমন অন্যায়, তেমনি একজন ভালো মানুষের কাজকে স্বীকৃতি না দেওয়াও অন্যায়।
সাদা যদি সাদা হয়, তাকে সাদা বলতে হবে। কালো যদি কালো হয়, তাকে কালো বলার সাহসও থাকতে হবে।
সব পুলিশ খারাপ নয়।
ঠিক তেমনি সব ডাক্তারও ‘কসাই’ নন।
হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরে, রোগীর ভিড়ের মধ্যে, রাত গভীর হওয়ার পরও যখন একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করে যান, তখন তাঁর সেই নীরব শ্রমের কথাও বলা দরকার।
কারণ সমাজ শুধু সমালোচনায় বদলায় না; ভালো কাজের স্বীকৃতিও মানুষকে আরও ভালো কাজের অনুপ্রেরণা দেয়।
ডা. আরাফাতুর রহমান হয়তো প্রতিদিন নিজের দায়িত্বটুকুই পালন করছেন। হয়তো তিনি এটাকে বিশেষ কিছু মনে করেন না। কিন্তু একজন রোগী যখন চিকিৎসা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, একজন স্বজন যখন প্রিয় মানুষটিকে সুস্থ হওয়ার পথে দেখতে পান, তখন একজন চিকিৎসকের পরিশ্রমের সার্থকতা সেখানেই।
হাসপাতালের আলো যখন রাত গভীরেও জ্বলতে থাকে, তখন সেই আলোর নিচে কিছু মানুষ নীরবে কাজ করে যান। তাঁদের কেউ হয়তো খবরের শিরোনাম হন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনায় আসেন না।
তবু তাঁদের হাত ধরেই কোনো কোনো মানুষ ফিরে পান জীবনের আশা।
ডা. আরাফাতুর রহমান তাঁদেরই একজন, অন্তত যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের চোখে।
এই নীরব পরিশ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা।