স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পি এম

“আমার নাতি চাই-ই… নাতি ছাড়া আমি বাঁচমু না ভাই!”

ছবি: সংগৃহীত

কথাগুলো বলার সময় বৃদ্ধ মানুষটির কণ্ঠ কাঁপছিল। চোখ বেয়ে নামছিল অশ্রু। বুকের ভেতরে যেন জমে থাকা সব অসহায়ত্ব একসঙ্গে বেরিয়ে আসছিল কান্না হয়ে। তাঁর কাছে তখন এক লাখ টাকা, অভাব, সামাজিক লজ্জা কিংবা অন্য কোনো যুক্তির কোনো মূল্য নেই। তাঁর পৃথিবীজুড়ে তখন কেবল একটিই দাবি—হারিয়ে যাওয়া নাতিকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

অভিযোগ, তাঁর নিজের সন্তানই এক লাখ টাকার বিনিময়ে নিজের শিশুসন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

সাংবাদিক যখন বৃদ্ধকে প্রশ্ন করেন, “আপনার ছেলে তো এক লাখ টাকা নিয়ে বাচ্চা বিক্রি করছে।”

প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগেই যেন ভেঙে পড়েন তিনি।

কাঁদতে কাঁদতে প্রায় পাগলপ্রায় কণ্ঠে বলেন, “তা ওর কাছ থেকে নেন। আমি কিছুই বুঝতে চাই না। আমি আমার নাতি চাই। আমার নাতি ছাড়া আমি বাঁচমু না।”

একজন মানুষের কাছে এক লাখ টাকা কত বড় অঙ্ক—সেটি নির্ভর করে তাঁর জীবনের বাস্তবতার ওপর। কারও কাছে এটি কয়েক মাসের সংসার খরচ, কারও কাছে বছরের সঞ্চয়। কিন্তু একজন দাদার কাছে তাঁর নাতির মূল্য যে কোনো টাকার অঙ্কের চেয়েও অনেক বড়—সেই সত্যটিই যেন নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন এই বৃদ্ধ।

একটি শিশুর দাম কি কখনো এক লাখ টাকা হতে পারে?

আইন, সমাজ কিংবা নৈতিকতার ভাষায় এর উত্তর স্পষ্ট। একটি শিশুর কোনো দাম হয় না। মানুষ বিক্রির বস্তু নয়। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা কখনো কখনো মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে মানবিকতা আর অসহায়ত্বের মধ্যে ভয়ংকর সংঘাত তৈরি হয়।

সেই সংঘাতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এই বৃদ্ধ দাদা।

একদিকে তাঁর নিজের সন্তান—যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজের সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন। অন্যদিকে সেই শিশুটি, যার সঙ্গে দাদার সম্পর্ক মাত্র কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানের হলেও ভালোবাসার দূরত্ব এক মুহূর্তেরও নয়।

বাবা হয়তো কোনো পরিস্থিতির কাছে হেরে গেছেন, কোনো সংকটে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিংবা এমন এক অপরাধ করেছেন, যার ব্যাখ্যা সহজ নয়। কিন্তু দাদার কাছে এসবের কোনো ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয়।

তিনি বিচার চাননি।

তিনি অর্থ ফেরত চাননি।

তিনি ছেলের শাস্তি নিয়েও কথা বলেননি।

তিনি শুধু চেয়েছেন তাঁর নাতিকে।

“টাকা ওর কাছ থেকে নেন… আমার নাতিটারে ফিরাইয়া দেন।”

এই একটি আকুতির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে নিঃস্বার্থ অনুভূতির নাম—ভালোবাসা।

আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রতিদিন কত নেতিবাচক খবর দেখি। সহিংসতা, প্রতারণা, স্বার্থপরতা, পারিবারিক ভাঙন আর মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতার গল্পে ভরে থাকে চারপাশ। কখনো কখনো মনে হয়, মানবিকতা কি সত্যিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে?

কিন্তু তারপর এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা মনে করিয়ে দেয়—না, পৃথিবী এখনও পুরোপুরি পচে যায়নি।

একজন বৃদ্ধ মানুষ তাঁর নাতির জন্য কাঁদছেন। নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই ঘটনার জটিল হিসাব করতে চান না। তিনি জানেন না আইন কী বলবে, মামলা কত দূর যাবে, কে দোষী আর কে নির্দোষ। তাঁর কাছে এসবের চেয়ে বড় সত্য একটাই—তাঁর নাতি কোথায়?

হয়তো শিশুটি এখনও এত ছোট যে সে বুঝতেই পারেনি, তাকে ঘিরে কত বড় এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দাদার বুক জানে, সেই ছোট্ট মানুষটিই তাঁর জীবনের কত বড় অংশ।

একটি শিশুর ছোট্ট হাত কখন যে একজন বৃদ্ধ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে, তার কোনো হিসাব নেই। নাতির একটি হাসি, একটি ডাক, কোলে এসে বসা কিংবা ছোট্ট হাত দিয়ে দাদার আঙুল আঁকড়ে ধরা—এসবের কোনো বাজারমূল্য হয় না।

তাই এক লাখ টাকা তাঁর কাছে অর্থহীন।

কারণ, ভালোবাসা কখনো টাকায় মাপা যায় না।

সমাজের চারপাশে যখন নেগেটিভিটির এত ভিড়, তখন এই বৃদ্ধের কান্না কেবল একটি পরিবারের বেদনার গল্প নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের ভেতরে এখনও ভালোবাসা আছে। এখনও এমন সম্পর্ক আছে, যেখানে হিসাবের খাতা চলে না।

একজন বাবা হয়তো তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন টাকার বিনিময়ে।

কিন্তু একজন দাদা তাঁর নাতিকে ফিরে পেতে পৃথিবীর সব টাকাকেই অস্বীকার করতে প্রস্তুত।

হয়তো এ কারণেই পৃথিবী এখনও সুন্দর।

হয়তো এ কারণেই এত অন্ধকারের মধ্যেও মানবতার ছোট্ট একটি আলো জ্বলে থাকে।

সেই আলো আজ এক বৃদ্ধের অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শুধু একটি কথাই বলছে—

“আমার নাতি চাই… নাতি ছাড়া আমি বাঁচমু না ভাই!”