স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৯ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ এএম

‘চলো, এবার বাড়ি যাই’-হাসপাতালের সবচেয়ে সুন্দর বাক্য!

ছবি: সংগৃহীত

হাসপাতালের কেবিনে ঢুকতেই তিনি হালকা হাসলেন। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে দীর্ঘ অপেক্ষার রেখা। চিকিৎসার বড় অংশ শেষ। রিপোর্ট ভালো। এখন শুধু চিকিৎসকের ছাড়পত্রের অপেক্ষা।

কথা বলতে বলতে একসময় খুব আস্তে করে বললেন, "আর ভালো লাগছে না। এবার শুধু বাড়ি ফিরতে চাই।"

কথাটা শুনে মনে হলো, হাসপাতালের প্রতিটি শয্যায় যেন একই গল্পের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় লেখা থাকে। কারও রোগের নাম ক্যানসার, কারও হার্টের সমস্যা, কারও দুর্ঘটনার আঘাত, কারও অস্ত্রোপচারের পরের দিন। বয়স আলাদা, পেশা আলাদা, জীবনের গল্প আলাদা। কিন্তু সবার অপেক্ষা যেন একটাই-বাড়ি ফেরা।

হাসপাতাল মানুষকে সময়ের অন্য এক সংজ্ঞা শেখায়। এখানে দিন শুরু হয় চিকিৎসকের রাউন্ড দিয়ে। নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ আসে, রক্ত নেওয়া হয় পরীক্ষার জন্য, এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানের ডাক পড়ে, ফিজিওথেরাপিস্ট আসেন, ডায়েটিশিয়ান খাবারের তালিকা বদলে দেন। প্রতিটি মুহূর্ত যেন অদৃশ্য এক ছন্দে বাঁধা।

বাইরে থেকে আমরা হয়তো শুধু চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রনটাই দেখি। কিন্তু একজন রোগীকে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানোর পেছনে কত মানুষের নীরব পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে, হাসপাতালের ভেতরে না এলে তা বোঝা যায় না।

চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন, নার্স দিন-রাত রোগীর পাশে থাকেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সংক্রমণ ঠেকাতে নিরলস কাজ করেন। ওয়ার্ডবয় এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে রোগীকে নিয়ে যান। ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা হয়, ফার্মাসি থেকে ওষুধ পৌঁছে যায়, রান্নাঘরে রোগীর জন্য আলাদা খাবার তৈরি হয়। নিরাপত্তারক্ষীরা হাসপাতালের শৃঙ্খলা বজায় রাখেন।

একজন রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার গল্পে প্রত্যেকেই নীরব নায়ক।

গত কয়েক বছরে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাও অনেক বদলেছে। এমন অনেক রোগ, যেগুলো একসময় মৃত্যুর সমার্থক মনে হতো, আজ দ্রুত শনাক্ত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অস্ত্রোপচার, নতুন ওষুধ আর দক্ষ চিকিৎসাসেবার কারণে হাজার হাজার মানুষ নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছেন।

মানুষও আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, এসব এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন আলোচনার বিষয়। এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আশার।

তবুও বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোথাও রোগীর চাপ বেশি, কোথাও জনবল কম, কোথাও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর চিকিৎসা, জরুরি অস্ত্রোপচার, নবজাতকের জন্ম, সংকটাপন্ন রোগীর জীবন বাঁচানোর লড়াই, সব মিলিয়ে হাসপাতাল আসলে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের নাম।

আর সেই কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে আনন্দের সংবাদটি খুব ছোট একটি বাক্য,

"আজ রোগী বাড়ি যাচ্ছেন।"

এই কয়েকটি শব্দের আনন্দ কোনো ওষুধের বোতলে মাপা যায় না।

নিজের বিছানা, নিজের বালিশ, জানালার পাশে বসে বিকেলের আলো দেখা, পরিচিত চায়ের কাপ, পরিবারের মানুষের মুখ, এসবই যেন তখন পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ হয়ে ওঠে।

আজ প্রতিবেশীর চোখে সেই আকাঙ্ক্ষা দেখলাম।

ফিরতে ফিরতে মনে হলো, সুস্থ থাকলে আমরা বাড়িটাকে খুব স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। অথচ অসুস্থতার কয়েকটি দিনই বুঝিয়ে দেয়, বাড়ি শুধু ইট, বালু আর চারটি দেয়ালের নাম নয়।

বাড়ি মানে নিরাপত্তা।

বাড়ি মানে পরিচিত গন্ধ।

বাড়ি মানে প্রিয় মানুষের উপস্থিতি।

বাড়ি মানে এমন এক আশ্রয়, যেখানে মানুষ শুধু বিশ্রাম নেয় না, ধীরে ধীরে আবার বেঁচে ওঠে।

হাসপাতাল মানুষকে চিকিৎসা দেয়। জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। কিন্তু সেই জীবনের পূর্ণতা যেন ফিরে আসে তখনই, যখন পরিবারের কেউ হাসিমুখে এসে বলে,

"চলো, এবার বাড়ি যাই।"

মজার বিষয়, হাসপাতাল থেকে খুব কম মানুষই একা বাড়ি ফেরেন। কারও হাত ধরে ছেলে, কারও মেয়ে, কারও স্বামী বা স্ত্রী, কারও ভাই-বোন, কারও বন্ধু, আবার কখনও একজন প্রতিবেশী।

অসুস্থতার সময় এই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটুকুই হয়তো সবচেয়ে বড় ওষুধ।

কারণ চিকিৎসা শরীরকে সুস্থ করে, আর মানুষের ভালোবাসা সুস্থ করে তোলে মনকে। আর এই দুটো একসঙ্গে মিললেই সত্যিকার অর্থে একজন মানুষ বাড়ি ফেরেন।