স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ পি এম

কানের শোঁ শোঁ শব্দের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলল রবিউলের

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমুর সাথে রবিউল ইসলাম।

রাত নামলেই যেন শুরু হতো নতুন এক যন্ত্রণা। চারপাশ যখন নীরব হয়ে আসত, তখন গাইবান্ধার রবিউল ইসলামের কানে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত শোঁ শোঁ শব্দ। শুধু শব্দ নয়, সেটি যেন তার নিজের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত। দিন যায়, রাত যায়। কিন্তু কানের ভেতরের সেই অদৃশ্য শব্দ থামত না।

ঘুম হারিয়ে গিয়েছিল রবিউলের। স্বাভাবিক কাজকর্মে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। একসময় জীবনের ছোট ছোট স্বাভাবিক মুহূর্তও তার কাছে অসহনীয় মনে হতে শুরু করে।

সমস্যার সমাধানে তিনি একের পর এক চিকিৎসকের কাছে গেছেন। করেছেন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। খরচ হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছেন একই সমস্যাকে সঙ্গী করে-কানের ভেতরের সেই অবিরাম শব্দ।
ধীরে ধীরে হতাশা তাকে গ্রাস করতে শুরু করে।

রবিউল হয়তো ভাবতেও পারেননি, যে সমস্যার কারণে তিনি বছরের পর বছর কানের চিকিৎসা করিয়ে বেড়িয়েছেন, তার মূল কারণ আসলে কানে নয়। সমস্যাটি ছিল তার মস্তিষ্কের রক্তনালিতে।

শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, রবিউলের মস্তিষ্কের একটি ভেনাস সাইনাস নামের রক্তনালির অংশ সংকুচিত হয়ে গেছে। এই সংকোচনের কারণে রক্তপ্রবাহে পরিবর্তন হচ্ছিল এবং তার প্রভাবেই তিনি হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে শোঁ শোঁ শব্দ শুনছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় পালসেটাইল টিনিটাস।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমুর কাছে আসার পর রবিউলের সমস্যার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু হয়।

বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে করা হয় ডিজিটাল সাবট্রাকশন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা ডিএসএ। তাতেই মস্তিষ্কের রক্তনালির সংকোচনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরপর নেওয়া হয় এমন এক চিকিৎসার সিদ্ধান্ত, যেখানে বড় ধরনের কোনো কাটাছেঁড়া করতে হবে না।

ক্যাথেটারের মাধ্যমে শরীরের রক্তনালির ভেতর দিয়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছানো হয় মস্তিষ্কের সংকুচিত রক্তনালির কাছে। সেখানে বসানো হয় একটি স্টেন্ট, যা সংকুচিত অংশটিকে খুলে দিয়ে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে।
আর তারপরই যেন ঘটল রবিউলের জীবনের বহু প্রতীক্ষিত পরিবর্তন।

বছরের পর বছর যে শব্দ তাকে ঘুমাতে দেয়নি, স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দেয়নি, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল, স্টেন্ট বসানোর পর সেই শব্দ আর নেই।

রবিউল ইসলাম বলেন, কানের শোঁ শোঁ শব্দের কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারতেন না। কোনো কাজেও মন বসত না। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়েও যখন কোনো ফল পাননি, তখন তিনি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলেন।
কিন্তু চিকিৎসার পর তার জীবনে ফিরেছে নীরবতা, যে নীরবতার জন্য তিনি এতদিন অপেক্ষা করেছিলেন।

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, পালসেটাইল টিনিটাসের বেশিরভাগ কারণ কানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তনালির অস্বাভাবিকতাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। কিন্তু এই কারণটি অনেক সময় শনাক্ত না হওয়ায় রোগীরা দীর্ঘদিন এক চিকিৎসকের কাছ থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে ঘুরতে থাকেন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, কানে শব্দ যদি হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করে, তাহলে বিষয়টিকে সাধারণ কানের সমস্যা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তনালিজনিত কারণ আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।

রবিউলের গল্প শুধু একটি জটিল চিকিৎসা সফল হওয়ার গল্প নয়। এটি একজন মানুষের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার গল্প। ঘুমহীন রাত, অসংখ্য পরীক্ষা, ব্যর্থতার হতাশা এবং মানসিক ভেঙে পড়ার পর অবশেষে তার জীবনে ফিরে এসেছে স্বস্তি।

একসময় নীরবতা ছিল রবিউলের কাছে অধরা। এখন সেই নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

কানে আর সেই শোঁ শোঁ শব্দ নেই।

আবার নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন রবিউল।