স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৪ পি এম

সংকটের মাঝেও নিরাপদ মাতৃত্বের ঠিকানা ফুলবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

ছবি: সংগৃহীত

একদিকে চিকিৎসকের ঘাটতি, অন্যদিকে নেই গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ। আয়া নেই, ওয়ার্ড বয়ও নেই। তারপরও প্রতিদিন নতুন প্রাণের প্রথম কান্নায় মুখর হয়ে ওঠে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সীমিত জনবল আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করে একের পর এক সফল স্বাভাবিক প্রসব করিয়ে এখন অনেক গর্ভবতী মায়ের ভরসার নাম এই সরকারি হাসপাতাল।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন, মাত্র ছয় মাসে হাসপাতালটিতে মোট ৪৩১টি প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৪১৩টি হয়েছে স্বাভাবিকভাবে। মাত্র ১৮টি ক্ষেত্রে জটিলতার কারণে সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজন হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ প্রসবই হয়েছে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে, যা উপজেলা পর্যায়ের একটি সরকারি হাসপাতালের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন।

একসময় সন্তান জন্মদানের জন্য অনেক পরিবারকে ছুটতে হতো বেসরকারি ক্লিনিকে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত প্রয়োজন না থাকলেও সিজারিয়ান অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ ছিল। এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দক্ষ মিডওয়াইফ, নার্স ও চিকিৎসকদের সমন্বিত সেবার কারণে দিন দিন বাড়ছে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতিও মানুষের আস্থা ফিরে আসছে।

হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, প্রসব-পূর্ব পরীক্ষা থেকে শুরু করে সন্তান জন্মের পর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গর্ভবতী মায়েদের পাশে রয়েছেন মিডওয়াইফরা। শুধু চিকিৎসাই নয়, তারা গর্ভকালীন পুষ্টি, মানসিক প্রস্তুতি, প্রসবের লক্ষণ এবং নবজাতকের পরিচর্যা নিয়েও নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।

চন্দ্রপুর গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা কৃষ্ণা রানী বলেন, "এখানকার আপারা আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো যত্ন নেন। কী খাব, কীভাবে চলাফেরা করব, কোন সমস্যা হলে কী করতে হবে, সবকিছু খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন। তাদের কারণে অনেক ভয় কেটে গেছে।"

গফুরহাট এলাকার রশিদা বেগম বলেন, "সরকারি হাসপাতালে এত ভালো সেবা পাব, আগে ভাবিনি। চিকিৎসক ও মিডওয়াইফরা সময় নিয়ে কথা বলেন। প্রয়োজনীয় ওষুধও বেশিরভাগ সময় পাওয়া যায়।"

হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেওয়া আসমা বেগমের চোখে তখনও মাতৃত্বের আনন্দ। তিনি বলেন, "নরমাল ডেলিভারি নিয়ে খুব ভয় ছিল। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স আর মিডওয়াইফরা আমাকে সাহস দিয়েছেন। তাদের সহযোগিতায় কোনো অপারেশন ছাড়াই আমার সন্তান হয়েছে। এখন আমরা দুজনই সুস্থ আছি। যদি বেসরকারি হাসপাতালে যেতাম, হয়তো অনেক টাকা খরচ করে সিজার করাতে হতো।"

এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন হাসপাতালের মাত্র ছয়জন মিডওয়াইফ। সীমিত জনবল নিয়েও দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তারা।

মিডওয়াইফ আফরোজা বানু বলেন, "রোগীর চাপ অনেক বেশি। কখনো কখনো বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও থাকে না। তারপরও আমরা চেষ্টা করি প্রতিটি মাকে নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে। যদি আরও মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।"

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৯টি, মার্চে ৬৪টি, এপ্রিলে ৬১টি, মে মাসে ৭২টি এবং জুনে ৬৬টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। একই সময়ে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে মাত্র ১৮টি।

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। ৫০ শয্যার হাসপাতালটির চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪১টি হলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১৪ জন। শূন্য রয়েছে ২৭টি পদ। হাসপাতালে গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ নেই। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, আয়া ও ওয়ার্ড বয়ের একাধিক পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি। অথচ প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছেই। অনেক সময় ৫০ শয্যার হাসপাতালে ৮০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন।

হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. মো. আলমগীর কবির বলেন, "জনবল সংকট আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।"

দিনাজপুরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম রসুল রাখি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকসংকট কমাতে নতুন চিকিৎসকদের পদায়ন করা হয়েছে। এরপরও ফুলবাড়ীতে রোগীর চাপ বেশি থাকায় প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন কমিয়ে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে দক্ষ মিডওয়াইফভিত্তিক সেবা অত্যন্ত কার্যকর। ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই সাফল্য দেখিয়ে দিচ্ছে, জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটলে সরকারি হাসপাতালেও নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করা সম্ভব। আর সেই কারণেই আজ দিনাজপুরের বহু পরিবারের কাছে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু একটি হাসপাতাল নয়, নিরাপদ মাতৃত্বের এক নির্ভরতার নাম।