স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে একটি ওষুধ। এমন অনেক শিশু ও তরুণ আছে, যাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসই যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক দীর্ঘ লড়াই। জন্মগত বিরল রোগ সিস্টিক ফাইব্রোসিস (সিএফ) তাদের ফুসফুসকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়, শরীরকে দুর্বল করে ফেলে, আর পরিবারের সামনে রেখে যায় এক অসহায় বাস্তবতা, চিকিৎসা আছে, কিন্তু সেই চিকিৎসার মূল্য তাদের নাগালের বহু বাইরে।
বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর সিএফ চিকিৎসাগুলোর একটি ট্রিকাফটা। কিন্তু বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হওয়ায় এই ওষুধ অধিকাংশ রোগীর কাছে কেবলই অধরা স্বপ্ন। অনেক পরিবার জানে, সন্তানের জীবন বাঁচানোর ওষুধটি পৃথিবীতে আছে, তবু তারা সেটি কিনতে পারে না। অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।
এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই এক মানবিক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের প্রথম দিকের জেনেরিক সংস্করণ হিসেবে ‘ট্রিকো’ বাজারে এনে সেই ব্যয়বহুল চিকিৎসাকে অনেক বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছে।
টঙ্গীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে প্রতীকীভাবে ওষুধ তুলে দেওয়া হয়। এটি শুধু একটি ওষুধ হস্তান্তরের অনুষ্ঠান ছিল না; বরং ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য পরিবারের কাছে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়ার এক আবেগঘন মুহূর্ত।
বেক্সিমকোর তৈরি ট্রিকো-এর বার্ষিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার, যা মূল ব্র্যান্ডের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কম। শিশুদের জন্য এর খরচ আরও কম, মাত্র ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার। অর্থাৎ, যে অর্থে আগে একজন শিশুর চিকিৎসা সম্ভব হতো, এখন সেই একই অর্থে প্রায় ৫৮ জন শিশুর চিকিৎসা করা সম্ভব হবে।
সিস্টিক ফাইব্রোসিস এমন একটি বংশগত রোগ, যেখানে ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রে ঘন শ্লেষ্মা জমে শ্বাস নেওয়া ও খাবার হজম করা কঠিন হয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ধারণা করা হয়, বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং আরও প্রায় ৮০ হাজার রোগী এখনও শনাক্ত হয়নি। তাদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা।
এই উদ্যোগকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রোগী অধিকারকর্মীরাও। ‘রাইট টু ব্রিদ’ গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের নেত্রী গেইল প্লেজার বলেন, জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে আধুনিক সিস্টিক ফাইব্রোসিস চিকিৎসা এখনও অধিকাংশ রোগীর নাগালের বাইরে। তার মতে, বেক্সিমকোর এই উদ্যোগ চিকিৎসা বৈষম্য কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা বলেন, বিরল ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের অপূর্ণ চিকিৎসা-চাহিদা পূরণে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সাশ্রয়ী মূল্যে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বিশ্বজুড়ে রোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারা তাদের জন্য গর্বের বিষয়।
কখনও কখনও একটি ওষুধ শুধু রোগের চিকিৎসা করে না, ফিরিয়ে দেয় একটি শিশুর হাসি, একটি মায়ের স্বস্তি, একটি বাবার আশা এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষের জন্য ‘ট্রিকো’ হয়তো ঠিক তেমনই এক নতুন ভোরের নাম, যেখানে অর্থ নয়, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারটাই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।