স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৮ জুন ২০২৬, ১১:২৪ পি এম

তরুণের মানবিকতা ও একটি পরিবারের পুনর্জন্মের গল্প!

ছবি: সংগৃহীত

রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। ঢাকার ব্যস্ত শহর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের করিডোরে তখনও চলছিল এক অসহায় পরিবারের জীবনযুদ্ধ।

একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর স্ত্রী জরুরি সিজারের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছিলেন এক ফুটফুটে শিশুর। জন্মের পরপরই নবজাতকটির অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে এনআইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। পরিবারটি প্রথমে সরকারি হাসপাতালে ছুটে যায়। কিন্তু সেখানে জানানো হয়, এনআইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই।

অশিক্ষিত, দরিদ্র বাবা-মা বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। হাসপাতালের মেঝেতে বসে দিন কাটাচ্ছিলেন তারা, কোলে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা সন্তান। ঠিক সেই সময় এক দালালের খপ্পরে পড়ে শিশুটিকে ভর্তি করানো হয় ঢাকার একটি অভিজাত বেসরকারি হাসপাতালে।

আট দিন ধরে চলল চিকিৎসা। শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছিল হাসপাতালের বিল। চিকিৎসা, ওষুধ এবং এনআইসিইউ খরচ মিলিয়ে বিল দাঁড়াল প্রায় ৪৮ হাজার টাকা।

শিশুটির বাবা একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। আত্মীয়-স্বজনের কাছে হাত পেতেও কোনো সাহায্য পাননি। নিজের ব্যবহারের মোবাইল ফোন বিক্রি করে কয়েকদিনের খাবার ও যাতায়াতের খরচ চালিয়েছেন। অন্যদিকে শিশুটির মা—এক কিশোরী, যার বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর বয়সে। কামরাঙ্গীরচরের বস্তিতে তাদের সংসার। পাশে বলতে ছিলেন শুধু এক বৃদ্ধ নানী।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মানবিক কারণে এনআইসিইউর বড় অংশের বিল মওকুফ করলেও ওষুধের জন্য বকেয়া ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ না করলে ছাড়পত্র দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেয়। তাদের অবস্থাও ছিল সীমাবদ্ধ; ওষুধের বিল ছিল আলাদা প্রতিষ্ঠানের।

এরপর শুরু হয় এক বৃদ্ধ নানীর আর্তনাদময় সংগ্রাম।

হাতে নাতির চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে তিনি বের হন মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সেই মানুষটি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নেমে পড়েন ভিক্ষার ঝুলিতে।

সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের সামনে কয়েকজন বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেখানে এসে দাঁড়ান সেই বৃদ্ধা। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “টাকার অভাবে হাসপাতাল আমার নাতিকে ছাড়ছে না।”

কথাগুলো শুনে থমকে যান এক তরুণ। তিনি মেডিকেল রিপোর্টগুলো পড়েন। বন্ধুদের নিয়ে ছুটে যান হাসপাতালে। কথা বলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে, কথা বলেন শিশুটির অসহায় পরিবারের সঙ্গে।

চারদিকে শুধু কান্না আর অসহায়ত্ব।

মায়ের চোখে সন্তানের জন্য আতঙ্ক, বাবার চোখে ব্যর্থতার বেদনা, আর নানীর ঠোঁটে শুধু আল্লাহর কাছে সাহায্যের প্রার্থনা।

সেই মুহূর্তে তরুণটি একটি সিদ্ধান্ত নেন।

ঈদ উপলক্ষে নিজের এবং স্ত্রীর জন্য যে টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন, সেটিই ব্যয় করবেন এই পরিবারটির জন্য।

“রিজিকের মালিক আল্লাহ,” মনে মনে বলেছিলেন তিনি।

বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালের কাউন্টারে গিয়ে পরিশোধ করে দেন সব বকেয়া টাকা। এরপর নিজ হাতে এনআইসিইউ থেকে শিশুটিকে বুঝে নিয়ে তুলে দেন তার মায়ের কোলে।

সেই মুহূর্তের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না।

মায়ের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। বাবার মুখে ছিল কৃতজ্ঞতার নীরবতা। বৃদ্ধ নানী শুধু দুই হাত তুলে দোয়া করছিলেন।

কিন্তু গল্প তখনও শেষ হয়নি।

রাত গভীর হয়ে এসেছে। জানা গেল, সারাদিন ধরে কেউই কিছু খায়নি। বাড়িতে সামান্য চাল থাকলেও রান্না করার জ্বালানি নেই। সিজার হওয়া মা অপুষ্টিতে ভুগছেন। নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়াতে হলে মায়ের নিজেরও পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন।

তাই তাদের নিয়ে যাওয়া হলো একটি ছোট্ট হোটেলে।

অনেকদিন পর হয়তো পেট ভরে খাবার খাচ্ছিলেন তারা।

আর সেই সময় নবজাতক শিশুটি ছিল তরুণটির কোলে।

খেতে খেতে শিশুটির মা ও বাবা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। হয়তো বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে এখনও কিছু মানুষ আছে যারা বিনিময় ছাড়া ভালোবাসতে জানে।

খাওয়া শেষে তাদের জন্য একটি অটোরিকশার ব্যবস্থা করা হয়। ভাড়া হিসেবে দেওয়া হয় ৪০০ টাকা। বিদায়ের আগে প্রসূতি মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় আরও ৫০০ টাকা।

বৃদ্ধ নানীকে বলা হয়, “এই টাকা দিয়ে ডিম কিনে মেয়েটাকে খাওয়াবেন। ওর শরীরের যত্ন নিতে হবে।”

অটোরিকশা ধীরে ধীরে অন্ধকার রাতের মধ্যে হারিয়ে যায়।

আর এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকেন সেই তরুণ।

সেদিন তিনি শুধু একটি শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনেননি; ফিরিয়ে দিয়েছিলেন একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আশা।

আর এই গল্পের আরেক নীরব নায়িকা ছিলেন তার স্ত্রী।

কারণ বাড়ি ফিরে যখন তিনি জানান যে ঈদের কেনাকাটার জন্য রাখা টাকাগুলো একটি অসহায় মা ও নবজাতকের জন্য ব্যয় করেছেন, তখন স্ত্রী কোনো অভিযোগ করেননি।

বরং হাসিমুখে বলেছিলেন—

“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছো।”