স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

মায়ের ইনজেকশন নবজাতকের শরীরে! চট্টগ্রামের সিএসসিআরের চিকিৎসা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম: মায়ের জন্য নির্ধারিত ইনজেকশন ভুল করে নবজাতক শিশুর শরীরে প্রয়োগ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল সিএসসিআরের (CSCR) বিরুদ্ধে।

পরিবারের অভিযোগ, ভুল ইনজেকশন দেওয়ার পর নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে এবং বর্তমানে শিশুটি জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নার্সের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। তবে ঘটনার পর ওই নার্সের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একটি নবজাতকের ক্ষেত্রে ভুল ওষুধ বা ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর। কারণ নবজাতকের শরীর প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। কোন ওষুধ কত মাত্রায়, কোন রোগীকে এবং কোন সময়ে দেওয়া হচ্ছে, সামান্য ভুলও সেখানে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সিএসসিআরের এই ঘটনা সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা, নার্সিং ব্যবস্থাপনা, রোগীর প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্ভুলতা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে।

এসব অভিযোগের সবগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগগুলোর ধরন রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

‘রোগীর দিকে নজর কম, মোবাইলেই বেশি মনোযোগ’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক মন্তব্যে রোগী ও স্বজনদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসক ও নার্সদের একটি অংশ দায়িত্ব পালনকালে রোগীর চেয়ে মোবাইল ফোনে বেশি মনোযোগী থাকেন। সিএসসিআরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই অভিযোগকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

তাদের প্রশ্ন, একজন নার্স যখন কোনো রোগীকে ইনজেকশন দিচ্ছেন, তখন রোগীর পরিচয়, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন, ওষুধের নাম, মাত্রা ও প্রয়োগের সময় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না?

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্ত ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কোনো রোগীকে ভুল ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ভুল নয়; হাসপাতালের ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

‘মায়ের জন্য নির্ধারিত ইনজেকশন শিশুকে’

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, মায়ের জন্য নির্ধারিত ইনজেকশন ভুল করে নবজাতককে দেওয়া হয়। এরপর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ঘটনার পর পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্বজনদের অভিযোগ, বিষয়টি কীভাবে ঘটল এবং এর জন্য কারা দায়ী, তা নিয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। দায়িত্বে থাকা নার্সের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর ওই নার্সকে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

তবে এ অভিযোগের সত্যতা এবং নার্সের অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি। 

চিকিৎসার পাশাপাশি অর্থ লেনদেন নিয়েও অভিযোগ

সিএসসিআরকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আরেক অভিযোগে এক রোগীর স্বজন দাবি করেছেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি তার মাকে নিয়ে হাসপাতালে এক্স-রে করাতে যান। প্রথমে এক্স-রের জন্য ৮০০ টাকা লাগবে বলা হয়। তিনি ১ হাজার টাকা দিতে গেলে খুচরা না থাকায় ৫০০ টাকা নেওয়া হয় এবং বাকি ২০০ টাকা পরে দেওয়ার কথা বলা হয়।

এক্স-রে সম্পন্ন হওয়ার পর তাকে একটি কাগজ দিয়ে কাউন্টারে পাঠানো হলে কাউন্টার থেকে নেওয়া ৫০০ টাকাই ফেরত দেওয়া হয়। স্বজনের দাবি, তিনি তখন ধরে নিয়েছিলেন হিসাব অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু পরদিন রিপোর্ট নেওয়ার কথা জানানোর পর রাত পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে একাধিকবার ফোন করে টাকা জমা দিতে অথবা বিকাশে পাঠাতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার প্রশ্ন ছিল, হাসপাতালের পক্ষ থেকে যদি টাকা ফেরত দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে পরে সেই টাকা নিয়ে এত রাতে কেন বারবার যোগাযোগ করা হলো? এ ঘটনায় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

অবশ্য এ অভিযোগের বিষয়েও হাসপাতালের বক্তব্য জানা যায়নি।

সিটিস্ক্যান রিপোর্টে ক্যান্সার, পরে পরীক্ষায় মেলেনি’

আরও গুরুতর অভিযোগ এসেছে একটি সিটিস্ক্যান রিপোর্টকে কেন্দ্র করে। এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, তার প্রয়াত বাবার সিটিস্ক্যান প্রতিবেদনে ক্যান্সারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

এরপর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তারা বাইরে বিভিন্ন পরীক্ষা করান। এতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে তার বাবার শরীরে ক্যান্সারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

তার অভিযোগ, সিএসসিআরের ওই রিপোর্টের কারণে তার বাবাকে পরবর্তী সময়ে মাংস, হাড়, কোষের রসসহ আরও বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে হয়েছে। এসব পরীক্ষার কারণে তার বাবা শারীরিকভাবে অনেক কষ্ট পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

মাকে হারানোর অভিযোগও সামনে

সিএসসিআর নিয়ে আরেকজন ব্যক্তি দাবি করেছেন, গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসা-সংক্রান্ত ভুলের কারণে তিনি তার মাকে হারিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তবে তার মায়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি হয়েছিল কি না এবং হাসপাতালের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি তদন্ত ছাড়া সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি

নবজাতককে ভুল ইনজেকশন দেওয়ার অভিযোগটি সত্য হলে এটি অত্যন্ত গুরুতর রোগী-নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা। তাই ঘটনার বিষয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

তদন্তে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি—মায়ের জন্য কোন ইনজেকশন নির্ধারণ করা হয়েছিল, শিশুকে কী ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, কে সেটি দিয়েছেন, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন কী ছিল, ওষুধ প্রয়োগের আগে রোগীর পরিচয় যাচাই করা হয়েছিল কি না, নার্সের দায়িত্ব কী ছিল এবং ঘটনার পর শিশুকে কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ, প্রেসক্রিপশন অনুসরণ, নার্সিং প্রটোকল এবং রোগী শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কারণ চিকিৎসাক্ষেত্রে ‘ভুল হয়েছে’ বলে বিষয়টি শেষ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভুলের কারণ শনাক্ত করা, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই রোগীর অধিকার রক্ষার মূল শর্ত।

মোবাইল নয়, রোগীর নিরাপত্তাই প্রথম

চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতে মোবাইল ফোন থাকা নিজে কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে যদি রোগীর প্রতি মনোযোগ কমে যায় বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো ভুল ঘটে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

একজন নার্সের হাতে যখন ইনজেকশন, তখন তার সামনে থাকা মানুষটি শুধু একজন ‘রোগী’ নন—তিনি কারও মা, বাবা, সন্তান কিংবা পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। আর নবজাতকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

তাই সিএসসিআরের সাম্প্রতিক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত শুধু একটি ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নয়; বরং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীর নিরাপত্তা, নার্সিং দায়িত্ব, ওষুধ প্রয়োগ এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথির নির্ভুলতা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেটিও সামনে আনার সুযোগ।

নবজাতকটির বর্তমান অবস্থা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করা হলে প্রকৃত ঘটনা আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধেও যাতে ভিত্তিহীন প্রচারণা না চলে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।