স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৩ পি এম

দেশে প্রথম রোবোটিক সার্জারি, চিকিৎসায় খুলল নতুন দিগন্ত

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: ঢাকার মাদানী এভিনিউর ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের অপারেশন থিয়েটারে সোমবার যুক্ত হলো দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন এক অধ্যায়। অত্যাধুনিক রোবোটিক প্রযুক্তির সহায়তায় একই দিনে দু’জন রোগীর সফল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো রোবোটিক সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সমর্থিত অত্যাধুনিক রোবোটিক সার্জিক্যাল প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের উন্নত চিকিৎসাসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দক্ষতা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে সম্পন্ন হওয়া এই অস্ত্রোপচার ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার প্রথম রোবোটিক অস্ত্রোপচারে পিত্তথলিতে পাথরে আক্রান্ত ৩৪ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগীর রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি করেন অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন। একই দিনে জরায়ু থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর রোবোটিক হিস্টেরেকটমি সম্পন্ন করেন অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী)।

অত্যাধুনিক মেডবট টুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিকেল টিম অস্ত্রোপচার দু’টি সম্পন্ন করে।

রোবোটিক সার্জারির বিশেষত্ব হলো—এখানে অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন চিকিৎসকই; রোবট চিকিৎসকের দক্ষতাকে আরও সূক্ষ্ম ও নির্ভুলভাবে প্রয়োগের সুযোগ করে দেয়। ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরের ভেতরের অংশ আরও স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হয়। অন্যদিকে রোবোটিক বাহুর বিস্তৃত নড়াচড়ার সক্ষমতার কারণে শরীরের সংকীর্ণ ও জটিল স্থানেও তুলনামূলকভাবে নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করা যায়।

রোবোটিক বাহু ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরানো সম্ভব হওয়ায় চিকিৎসকের হাতের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে সূক্ষ্ম নড়াচড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও আশপাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুরক্ষিত রেখে অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা বাড়ে। তুলনামূলকভাবে কম কাটাছেঁড়া, কম রক্তক্ষরণ এবং আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি কম হওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের পর রোগীর ব্যথা কমানো এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন বলেন, রোবোটিক সার্জারি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। রোবোটিক বাহুর বিস্তৃত নড়াচড়ার সুবিধার কারণে শরীরের জটিল ও সংকীর্ণ স্থানেও আরও নিখুঁতভাবে কাজ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও অঙ্গ নিরাপদ রাখতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি কম কাটাছেঁড়ায় চিকিৎসা এবং রক্তক্ষরণ কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।

দেশে রোবোটিক সার্জারির এই যাত্রা শুধু দুটি অস্ত্রোপচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না ইউনাইটেড হেলথকেয়ার। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কার্ডিয়াক সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি, জেনারেল সার্জারি, গাইনোকোলজি ও থোরাসিক সার্জারিসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসায় রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে।

অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান বলেন, শিগগিরই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সার্জিক্যাল বিভাগে রোবোটিক সার্জারির কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তার ভাষায়, উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের যেসব রোগীকে বিদেশে যেতে হয়, তাদের দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়াই মূল লক্ষ্য। দেশে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমবে। একই সঙ্গে চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী জটিল চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত চিকিৎসা সুবিধার সন্ধানে বিদেশমুখী এই রোগীদের জন্য দেশেই বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও দক্ষ চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রোবোটিক সার্জারির মতো প্রযুক্তির সফল ব্যবহার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ইউনাইটেড হেলথকেয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি জরুরি ও সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসা, উন্নত রোগ নির্ণয় এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

তাদের লক্ষ্য শুধু নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা নয়, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসার মান উন্নয়ন করা। একই সঙ্গে দেশের মানুষের বিদেশ-নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সোমবারের এই দুটি অস্ত্রোপচার তাই শুধু দুই রোগীর চিকিৎসার ঘটনা নয়; দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রারও একটি নতুন মাইলফলক। অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসকের দক্ষ হাতের সঙ্গে যখন যুক্ত হলো রোবোটিক প্রযুক্তির সূক্ষ্মতা, তখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার সামনে খুলে গেল নতুন এক সম্ভাবনার দরজা—যেখানে জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য একদিন হয়তো বিদেশ নয়, রোগীদের ভরসা হবে নিজের দেশই।