স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধের সঠিক সংরক্ষণ, নিরাপদ বিতরণ, রোগীকে ওষুধ সেবনের নিয়ম সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্তসংখ্যক ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নিয়োগের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, হাসপাতালের প্রতি ১০টি শয্যার বিপরীতে অন্তত একজন ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলে সরকারি ওষুধ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর কাছে সঠিক ওষুধ পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন ফার্মাসিস্টরা।
বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ক্রয়, গ্রহণ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও হিসাব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টদের পেশাগত দক্ষতা সরাসরি সম্পর্কিত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্তসংখ্যক ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট না থাকলে ওষুধের সঠিক সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে সরকারি সম্পদের অপচয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অনেক ওষুধ নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলোর পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হয়। বিশেষ করে তাপমাত্রাসংবেদনশীল ওষুধ, ভ্যাকসিন, ইনসুলিন ও বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফার্মাসিস্টদের মতে, আধুনিক ওষুধ ব্যবস্থাপনায় শুধু ওষুধ গুদামজাত করাই যথেষ্ট নয়; মেয়াদ, ব্যাচ নম্বর, স্টক ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ওষুধের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের দাবি, প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের পর্যাপ্ত নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের ওষুধ ব্যবস্থাপনা আরও বিজ্ঞানসম্মত করা সম্ভব।
মেয়াদোত্তীর্ণ বা ব্যবহার অনুপযোগী ওষুধ নিয়মবহির্ভূতভাবে ফেলে দিলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধের বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে পানি ও মাটিদূষণের পাশাপাশি জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন।
এ কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা করা, নিরাপদভাবে সংরক্ষণ এবং অনুমোদিত পদ্ধতিতে ধ্বংস বা অপসারণের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনবলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় অর্থে কেনা ওষুধের অপচয় রোধে সঠিক স্টক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের নিরাপদ অপসারণে কার্যকর নীতিমালা ও কঠোর তদারকি প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আইন, অধ্যাদেশ, নীতিমালা ও বিধিবিধান রয়েছে। এর মধ্যে ফার্মেসি অধ্যাদেশ, ১৯৭৬, ড্রাগস অ্যাক্ট, ১৯৪০ এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত অন্যান্য আইন ও বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে ওষুধ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা অথবা ভুল রোগীর কাছে ওষুধ চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতেও দক্ষ ফার্মাসিস্টের ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষ করে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ বিতরণের সময় রোগীকে ওষুধের সঠিক ব্যবহার, মাত্রা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে জানানো স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করলেও অনেক রোগী সঠিক সময়ে ওষুধ খাওয়া, নির্ধারিত মাত্রা বজায় রাখা বা বিশেষ কোনো সতর্কতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। ফলে ওষুধের ভুল ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত সেবন বা মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট রোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিতে পারেন। ওষুধের নাম, মাত্রা, সেবনের সময় এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া চিকিৎসাসেবার নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ফার্মাসিস্ট থাকলে রোগীদের ওষুধসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
ওষুধ ক্রয়, গ্রহণ, মজুত ও বিতরণের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ জড়িত। এ কারণে এই ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেশাজীবীদের দাবি, ওষুধ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ফার্মাসিস্টদের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানো হলে স্টক ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে। একই সঙ্গে ওষুধের হিসাব, মেয়াদ ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
ওষুধের ভুল সংরক্ষণ, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুত বা বিতরণ এবং অনুমোদিত বিধিবিধান লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। পরিস্থিতি ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল, জরিমানা এবং অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল আইন থাকলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি-উভয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা ও শয্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা।
তাদের মতে, প্রতি ১০টি হাসপাতাল শয্যার বিপরীতে অন্তত একজন ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে হাসপাতালের ওষুধ বিতরণ, সংরক্ষণ, স্টক ব্যবস্থাপনা, রোগী কাউন্সেলিং এবং ওষুধের নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
তাদের দাবি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও রোগীবান্ধব করতে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ফার্মাসিস্টদের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। পর্যাপ্তসংখ্যক ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নিয়োগ শুধু একটি পেশাগত দাবি নয়; বরং নিরাপদ ওষুধ ব্যবস্থাপনা, সরকারি সম্পদের সুরক্ষা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যানুপাতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নিয়োগ, আধুনিক ওষুধ ব্যবস্থাপনা চালু এবং ওষুধের অপচয় ও অনিয়ম রোধে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।