স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২৩ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৯ পি এম

নিয়মিত ‘দুধ চা’ খাওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ?

ছবি: সংগৃহীত

দুধ চা, বাবল টি, ফ্রুট টি কিংবা বিভিন্ন ধরনের মিল্ক টি-এসব পানীয় এখন শহুরে জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অফিসের বিরতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডা কিংবা বিকেলের অবসরে এক কাপ মিল্ক টি যেন অনেকের দৈনন্দিন রুটিন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাবল টি ও ফ্লেভারযুক্ত মিল্ক টির জনপ্রিয়তা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এই জনপ্রিয় পানীয় নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন গবেষকরা। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মিল্ক টি পান শুধু স্থূলতা বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চীনের বেইজিংয়ে ৫ হাজার ২৮১ জন কলেজ শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, যারা নিয়মিত মিল্ক টি পান করেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন) ও উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি) বেশি দেখা যায়। গবেষণায় সরাসরি বলা হয়নি যে মিল্ক টি-ই এসব মানসিক সমস্যার কারণ। তবে নিয়মিত ও অতিরিক্ত মিল্ক টি পান এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক (association) পাওয়া গেছে।

এর আগে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে পরিচালিত আরেকটি গবেষণাতেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত মিল্ক টি ও চিনি-সমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণকারীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।

কেন মিল্ক টি নিয়ে উদ্বেগ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ বাণিজ্যিক মিল্ক টিতে থাকে প্রচুর পরিমাণ চিনি, সিরাপ, কৃত্রিম ফ্লেভার, ক্রিমার এবং উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত উপাদান। অনেক সময় একটি বড় কাপ বাবল টি বা মিল্ক টিতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় চিনির বড় একটি অংশই চলে আসে।

অতিরিক্ত চিনি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়। এতে শরীরে ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং মেজাজের ওঠানামা হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন খাদ্যাভ্যাস চলতে থাকলে তা শরীরের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

শুধু পানীয় নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ

গবেষকরা বলছেন, যারা নিয়মিত মিল্ক টি পান করেন, তাদের অনেকের জীবনযাপনেও কিছু অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস দেখা যায়। যেমন—ফাস্ট ফুড বেশি খাওয়া, কম শারীরিক পরিশ্রম, অনিয়মিত ঘুম এবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকা। এসব কারণও বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, গবেষণাগুলো মিল্ক টি ও মানসিক সমস্যার মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে, কিন্তু এটিকে সরাসরি কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

তাহলে কি মিল্ক টি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?

পুষ্টিবিদদের মতে, মিল্ক টি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এটি যেন প্রতিদিনের অভ্যাস না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সপ্তাহে এক-দুদিন পরিমিত পরিমাণে পান করলে সাধারণত সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে প্রতিদিন একাধিক কাপ উচ্চ-চিনিযুক্ত মিল্ক টি পান করলে তা শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি ও চিনির বোঝা তৈরি করতে পারে।

যারা স্বাস্থ্য সচেতন, তারা চাইলে কম চিনি, কম সিরাপ বা চিনি ছাড়া দুধ চা বেছে নিতে পারেন। পাশাপাশি তাজা ফল, পানি, লেবুর শরবত বা চিনি ছাড়া চায়ের মতো স্বাস্থ্যকর পানীয়ও ভালো বিকল্প হতে পারে।

মানসিক সুস্থতার জন্য কী করবেন?

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মানসিক সুস্থতা শুধু একটি খাবার বা পানীয়ের ওপর নির্ভর করে না। বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগ-এসবই সুস্থ মানসিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

অতএব, মাঝে মধ্যে প্রিয় বাবল টি বা মিল্ক টি উপভোগ করতেই পারেন। কিন্তু সেটি যদি প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয় এবং অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরিযুক্ত পানীয় নিয়মিত গ্রহণ করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা শারীরিক ও মানসিক-উভয় স্বাস্থ্যের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গবেষকদের পরামর্শ, খাবার ও পানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনপ্রিয়তা নয়, বরং পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব বিবেচনা করেই খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। কারণ সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সুস্থ মনও একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি।