স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২০ জুন ২০২৬, ১২:১৮ এএম

হৃদযন্ত্রের নীরব বন্ধু, সুস্থ জীবনের প্রাকৃতিক সঙ্গী ডালিম

ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগ একটি নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালিজনিত জটিলতায়। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং পরিবেশগত নানা কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রকৃতিও মানুষের হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে কিছু মূল্যবান উপহার দিয়েছে। এমনই একটি ফল হলো ডালিম, যা বেদানা নামেও পরিচিত।

রুবি রঙের দানায় ভরপুর এই ফল শুধু স্বাদেই নয়, পুষ্টিগুণেও অনন্য। বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ডালিমকে স্বাস্থ্যরক্ষাকারী ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আধুনিক গবেষণাও এর নানা স্বাস্থ্য উপকারিতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুঁজে পেয়েছে। বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় ডালিমের ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।

হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। এ অবস্থায় ধমনির ভেতরের দেয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে প্লাক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্লাক ধমনিকে সরু করে দেয় এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডালিমে থাকা পিউনিকালাজিন (Punicalagin) ও অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। মানবদেহে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL) যখন অক্সিডাইজড হয়, তখন তা ধমনির দেয়ালে সহজে জমা হতে পারে এবং প্লাক তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়। ডালিমের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান এই জারণ প্রক্রিয়া কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ডালিম বা ডালিমের রস গ্রহণ করলে রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত হতে পারে। কিছু গবেষণায় ধমনিতে প্লাক জমার গতি কমার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন, তবুও বিজ্ঞানীরা ডালিমকে হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করেন।

ডালিমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রদাহনাশক বা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহকে বর্তমানে হৃদরোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে ধরা হয়। ডালিমে থাকা জৈব সক্রিয় উপাদানগুলো শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে, যা রক্তনালিকে সুস্থ রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

শুধু হৃদযন্ত্রই নয়, ডালিম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতাতেও অবদান রাখে। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, পটাশিয়াম এবং বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল। এসব উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, কোষের সুরক্ষা এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।

পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিন একটি মাঝারি আকারের ডালিম অথবা এক গ্লাস টাটকা ডালিমের রস খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যেতে পারে। তবে বাজারে পাওয়া অতিরিক্ত চিনি মেশানো প্যাকেটজাত জুসের পরিবর্তে তাজা ফল বা ঘরে তৈরি রস গ্রহণ করাই বেশি উপকারী।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ডালিম কোনো অলৌকিক ওষুধ নয়। শুধুমাত্র ডালিম খেয়েই হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সুস্থ হৃদযন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পরিহার, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম।

চিকিৎসকরা আরও সতর্ক করে বলেন, যারা হৃদরোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করেন, তারা খাদ্যতালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

প্রকৃতির এই লাল রত্ন শুধু একটি ফল নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডালিমের উপস্থিতি হয়তো হৃদযন্ত্রকে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম ও সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে। তাই সুস্থ জীবনের পথে ছোট্ট একটি পদক্ষেপ হিসেবে ডালিমকে খাদ্যতালিকায় জায়গা দেওয়া যেতে পারে।