স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকেই কাজের চাপ, মোবাইল ফোনে দীর্ঘ সময় কাটানো, রাত জাগা কিংবা অনিয়মিত জীবনধারার কারণে পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকের কাছে ৫–৬ ঘণ্টা ঘুমই স্বাভাবিক মনে হলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। নিয়মিত এর চেয়ে কম ঘুমালে শরীর ও মস্তিষ্কে নীরবে শুরু হয় একাধিক ক্ষতিকর পরিবর্তন, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম শুধু বিশ্রামের জন্য নয়; এটি শরীরের নিজেকে পুনর্গঠন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারাদিনের তথ্য সংরক্ষণ করে, কোষগুলো পুনর্গঠিত হয় এবং শরীরের বিভিন্ন হরমোন স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হয়।
নিয়মিত কম ঘুমের কারণে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে। নতুন তথ্য শেখা, মনে রাখা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। কর্মক্ষেত্রে ভুলের সংখ্যা বাড়ে, মনোযোগ কমে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। একই সঙ্গে গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র পরিচালনার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের অভাব শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ক্ষুধা বাড়ানোর ঘ্রেলিন (Ghrelin) হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, অন্যদিকে পেট ভরা অনুভূতি তৈরি করা লেপটিন (Leptin) হরমোনের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেতে শুরু করে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
এছাড়া স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল (Cortisol)-এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা নিয়মিত কম ঘুমান, তাদের মধ্যে স্থূলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ কম ঘুমের ফলে ক্ষুধা বাড়ে, শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism) ব্যাহত হয় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ক্লান্তির কারণে শারীরিক পরিশ্রমও কমে যায়, যা ওজন বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। অল্পতেই রাগ হওয়া, বিরক্তি, মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ এবং হতাশার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সম্পর্কেও পড়তে পারে।
চিকিৎসকরা জানান, ঘুমের সময় শরীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত কম ঘুমালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং অসুস্থতা থেকে সুস্থ হতেও বেশি সময় লাগে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং কিছু মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঘুমের ঘাটতি ইনসুলিনের কার্যকারিতাও ব্যাহত করতে পারে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে।
ধরা যাক, একজন চাকরিজীবী প্রতিদিন মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমান। কয়েকদিন পর থেকেই তিনি অফিসে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে পারেন, ছোটখাটো ভুল বাড়তে পারে এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অকারণে বিরক্ত আচরণ করতে পারেন। একইভাবে, পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা মনে করেন এতে বেশি প্রস্তুতি নেওয়া যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শেখা বিষয় মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষার সময় তার প্রভাব দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা গেলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ভালো থাকে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয় এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব।