স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬ পি এম

ডিবিকেপি হাসপাতালে ২০০ টাকায় গাইনি চিকিৎসা, থাকা ফ্রি

ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জ: চিকিৎসার জন্য দূর থেকে আসা রোগীদের কাছে শুধু চিকিৎসকের পরামর্শ বা ওষুধের খরচই বড় বিষয় নয়, যাতায়াত ও থাকার ব্যয়ও অনেক সময় বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এসব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এমন বাস্তবতায় সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা, নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা ও ওষুধ বিনা মূল্যে পাওয়ার সুযোগ এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের বিনা মূল্যে থাকার ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পশ্চিমগাঁও-বটতলা রোডে অবস্থিত ডিবিকেপি কমিউনিটি হাসপাতাল।

হাসপাতালটির সেবার পরিধিতে রয়েছে গাইনি ও প্রসূতিসেবা, মেডিসিন, শিশুস্বাস্থ্য, স্নায়ুরোগ, হাড় ও জোড়ার সমস্যা, জরুরি চিকিৎসা এবং ফিজিওথেরাপি। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষায় বিনা মূল্যে সেবা এবং অন্যান্য রক্ত পরীক্ষায় ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো।

‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, কারও জন্য নয় অবহেলা, চিকিৎসা নয় দয়া, এটি আপনার অধিকার’ স্লোগানকে সামনে রেখে পরিচালিত হাসপাতালটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ডিবিকেপির যৌথ উদ্যোগে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় পরিচালিত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

দূরের রোগীদের জন্য থাকার ব্যবস্থা

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ হাসপাতালটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজনকে চিকিৎসার প্রয়োজনে দূরবর্তী এলাকা থেকে রূপগঞ্জে আসতে হয়।

চিকিৎসা নিতে এসে তাঁদের কারও কারও একাধিক দিন অবস্থান করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হোটেল বা অন্য কোথাও থাকার খরচ অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালটিতে রোগীদের জন্য আলাদা থাকার কোয়ার্টারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা সেখানে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে থাকতে পারেন।

এতে চিকিৎসা গ্রহণের সময় আবাসন ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি থাকার ব্যয় বহন করা কঠিন, তাদের জন্য এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

২০০ টাকায় গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

নারীস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা যেকোনো কমিউনিটি হাসপাতালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিবিকেপি কমিউনিটি হাসপাতালে মাত্র ২০০ টাকার টিকিটে গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি শুক্রবার গাইনি চিকিৎসকের মাধ্যমে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতালটিতে প্রতি মঙ্গলবার মেডিসিন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে বিনা মূল্যে ওষুধ বিতরণের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব সেবার নির্দিষ্ট সময়সূচি, যোগ্যতা ও প্রাপ্যতা সম্পর্কে হাসপাতাল থেকে আগেই জেনে নেওয়া যেতে পারে।

পাঁচ ধরনের পরীক্ষা বিনা মূল্যে

রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যয় অনেক সময় দরিদ্র রোগীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা বিবেচনায় হাসপাতালটিতে পাঁচ ধরনের পরীক্ষা বিনা মূল্যে করার সুবিধা রয়েছে। পরীক্ষাগুলো হলো, র‌্যান্ডম ব্লাড সুগার (আরবিএস), সিরাম বিলিরুবিন, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন আর/ই এবং রক্তের গ্রুপ নির্ণয়।

এ ছাড়া অন্যান্য রক্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে। ডায়াবেটিস, কিডনির কার্যকারিতা, বিলিরুবিনের মাত্রা এবং প্রস্রাবের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে ধারণা পেতে এসব পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। তবে কোন রোগীর জন্য কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

স্বল্পমূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি

হাসপাতালটিতে প্রতি সোমবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার স্বল্পমূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার ব্যবস্থা রয়েছে। নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, প্রেগন্যান্সি প্রোফাইল আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য দিতে হয় ৩৫০ টাকা, লোয়ার অ্যাবডোমেন আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য ৫০০ টাকা এবং হোল অ্যাবডোমেন আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য ৬০০ টাকা।

গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিংবা পেটের বিভিন্ন সমস্যার মূল্যায়নে আল্ট্রাসনোগ্রাফির প্রয়োজন হতে পারে। হাসপাতালটির নির্ধারিত মূল্য কিছু রোগীর জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প হতে পারে। তবে পরীক্ষা করানোর আগে নির্ধারিত মূল্য, সময়সূচি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রবীণদের ফিজিওথেরাপি বিনা মূল্যে

বয়স্ক মানুষের চলাফেরার অসুবিধা, হাড়-জোড়ার সমস্যা এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় পুনর্বাসনসেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হাসপাতালটিতে ফিজিওথেরাপি সেবায় বয়সভিত্তিক বিশেষ সুবিধা রয়েছে।

৬০ বছরের কম বয়সীদের প্রতিবার ফিজিওথেরাপির জন্য দিতে হয় ১০০ টাকা। অন্যদিকে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ফিজিওথেরাপি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের হাঁটাচলা, পেশির শক্তি ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি তাঁদের চলাফেরা ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

প্রবীণদের জন্য বিনা মূল্যে এ সেবা দেওয়ার উদ্যোগ তাঁদের চিকিৎসাব্যয় কমানোর পাশাপাশি পুনর্বাসনসেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে।

বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসাসেবা

ডিবিকেপি কমিউনিটি হাসপাতালে শিশু ও কিশোর রোগ, মেডিসিন, স্নায়ুরোগ, বাত-ব্যথা, হাড় ও জোড়ার সমস্যা, অর্থোপেডিকস, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ, জরুরি চিকিৎসা এবং ফিজিওথেরাপি বিষয়ে সেবার ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতালটির চিকিৎসক তালিকায় রয়েছেন নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সানজিদা আক্তার; মেডিসিন ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. এম. ইকতিদার উর রহমান (মাহির); বাত-ব্যথা, হাড় ও জোড়ার রোগ এবং হাড়ভাঙার চিকিৎসক ডা. রাব্বি মাহমুদ; প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হোমায়রা বেগম; জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আল-আমিন মিয়া; গাইনি ও প্রসূতিবিষয়ক আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ইসরাত জাহান এবং ফিজিওথেরাপিস্ট পিঙ্কি আক্তার।

হাসপাতালটির এসব সেবার বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, এখানে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গাইনি চিকিৎসার নির্ধারিত ফি, বিনা মূল্যে নির্দিষ্ট পরীক্ষা ও ওষুধ, স্বল্পমূল্যের আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং প্রবীণদের ফিজিওথেরাপি সুবিধা রোগীদের জন্য সহায়ক হতে পারে।

সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব

বাংলাদেশে চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি পরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত ও আবাসন ব্যয় মিলিয়ে অসুস্থতার সময় পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।

ফলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া কিংবা চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

এ বাস্তবতায় কম খরচে চিকিৎসা, নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা ও ওষুধ বিনা মূল্যে পাওয়া এবং দূর থেকে আসা রোগীদের থাকার ব্যবস্থা, এ ধরনের উদ্যোগ জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এসব সুবিধার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সেবার ধারাবাহিকতা, চিকিৎসকের প্রাপ্যতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষার সুবিধা এবং রোগীদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানোর ওপর।

ডিবিকেপি কমিউনিটি হাসপাতালের উদ্যোগটি তাই কেবল কম খরচে চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীদের যে আনুষঙ্গিক ব্যয় ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়, তা কমানোর একটি প্রচেষ্টাও।

নিয়মিত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রবীণ রোগীদের পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা রোগীরাও এর সুফল পেতে পারেন।

সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও সেবার স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশও জরুরি। হাসপাতালটির সেবার সুযোগ, নির্ধারিত ফি, বিনা মূল্যের সুবিধা ও সময়সূচি সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা গেলে প্রয়োজনের সময় তাঁরা সহজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।